খুলনায় ভেনামি চিংড়ি চাষে ভাটা

খুলনায় উচ্চ ফলনশীল ভেনামি চিংড়ি চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও মানসম্মত পোনা সংকট, খাবারের উচ্চমূল্য এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতায় সাধারণ চাষিদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এতে চিংড়ি উৎপাদন ও রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।সম্প্রতি খুলনার বটিয়াঘাটার একটি ঘেরে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষে ভালো ফলন মিলেছে। জাল ফেলতেই উঠে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে চিংড়ি। তবে এই সাফল্য এখনো হাতেগোনা কয়েকটি ঘেরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চাষিদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে দেশে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষের অনুমোদন দেয় মৎস্য অধিদফতর। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলায় আটটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি উৎপাদন করে উল্লেখযোগ্য সফলতা পায়। তবে সাধারণ চাষিদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ নয়। ২০২৪ সালে ১৪ জন চাষি অনুমোদনের জন্য আবেদন করলেও চাষ শুরু করেন মাত্র আটজন। সবশেষ দুই বছরে নতুন করে কোনো আবেদন না আসায় ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চাষিরা বলছেন, অনুমোদন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় চাষ শুরু করতে দেরি হয়। পাশাপাশি মানসম্মত পোনা সময়মতো পাওয়া যায় না। আবার আমদানিনির্ভর পোনার ওপর অতিরিক্ত কর থাকায় দামও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে খাবারের উচ্চমূল্য যোগ হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে; যা রফতানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  বটিয়াঘাটার চাষি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ভেনামিতে উৎপাদন সম্ভাবনা ভালো হলেও পোনা সংকট ও খরচের কারণে ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই। এ বছর আমি প্রথমবারের মতো ভেনামি উৎপাদন করেছি। কিন্তু উৎপাদনে যে খরচ হয়, সেই খরচ দিয়ে বিদেশে রফতানি করা যায় না। ফলে দেশের বাজারেই বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় বাজার এতই পড়ে যায় যে লাভ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।’ একই এলাকার আরেক চাষি প্রসেনজিৎ দত্ত বলেন, ‘আমরা পরপর দুই বছর ভেনামি উৎপাদন করে বেশ ভালো সফলতা পেয়েছি। তবে বড় সমস্যা বাজারজাতকরণ। স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে আশানুরূপ লাভ হয় না। এজন্য উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। আর খরচ কমানোর জন্য দেশেই মানসম্মত পোনা পাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দেশে মানসম্মত পোনা পাওয়া যায় না। ভেনামির খাবার ও ওষুধ সবই আমাদের আমদানি করতে হয়। এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। মৎস্য অধিদফতর যদি ভেনামির এসব সমস্যা সমাধান করতে পারে, তাহলে ভেনামি চাষের পরিমাণ আরও বাড়বে।’ আরও পড়ুন: খুলনার ৬টি আসনে ৪৮ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা আরেক চাষি কৌশিক বাগচি বলেন, ‘আমি মূলত বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ করি। এতে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে আশেপাশের কেউ কেউ ভেনামি চাষ করলেও আমরা সাহস করতে পারছি না। কারণ দেশে যেসব পোনা পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই বাঁচে না। ভারত বা থাইল্যান্ড থেকে পোনা এনে চাষ করলে খরচ অনেক বেশি পড়ে। আমরা আশা করব, সরকার এসব বিষয় বিবেচনায় নেবে। তাহলে আমরাও এসব পোনা চাষ করতে পারব।’ এদিকে হ্যাচারি ও রফতানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোনা উৎপাদনের অনুমোদনে ধীরগতি এবং আমদানি পোনার ওপর অতিরিক্ত করের কারণে সময়মতো পোনা সরবরাহ করা যাচ্ছে না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রফতানিতেও।  বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এম এ হাসান পান্না বলেন, ‘ভেনামি চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজার বড় হলেও মানসম্মত পোনা নিশ্চিত ও উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে না আনলে কাঙ্ক্ষিত রফতানি প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।’ অন্যদিকে মৎস্য অধিদফতর বলছে, ভেনামি চাষের পরিমাণ বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খুলনার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, ‘মানসম্মত ভেনামি পোনার সংকট কাটাতে নতুন করে একাধিক হ্যাচারিকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন চাষিদের আগ্রহী করতে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও মাঠ পর্যায়ের তদারকি জোরদার করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে সমস্যা সমাধান হলে ভেনামি চাষে অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করছি।’ চলতি বছর খুলনায় প্রায় ৩৫ হেক্টর ঘেরে ভেনামি চিংড়ি চাষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আধা নিবিড় পদ্ধতিতে যেখানে হেক্টরপ্রতি গলদা বা বাগদার উৎপাদন ৮ থেকে ১০ টন, সেখানে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন ৩০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত হতে পারে। বিদ্যমান সংকট দূর করা গেলে ভেনামি চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি চিংড়ির বাজারও আরও চাঙা হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।