বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, ঘটনাবহুল ও আপসহীন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকাহত পুরো দেশ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মতভেদ ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তার বিদায়, জানাজা ও দাফনের খবর সংবাদমাধ্যমগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে বিশেষ গুরুত্ব, আবেগ ও ইতিহাসের ভার নিয়ে।জাতীয় দৈনিকগুলো বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবাসনকে তুলে ধরেছে নানা মাত্রায়— কোথাও আপসহীন রাষ্ট্রনায়ক, কোথাও সংগ্রামের প্রতীক, কোথাও এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। প্রায় সবগুলোই পত্রিকাই প্রকাশ করেছে বিশেষ মলাট। দৈনিক প্রথম আলো বিশেষ মলাট করেছে। পুরো পাতাজুড়ে বেগম জিয়ার মৃত্যু উপলক্ষে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে। পরের পাতায় ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া: জানাজা ও দাফন’ শিরোনামে পাতাজুড়ে ছবি প্রকাশ করেছে।আর মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করেছে- ‘‘জানাজায় জনতার মহাসমুদ্র’’। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কেবল একটি সড়ক নয়-যেন একটি গোটা বাংলাদেশ। একটি কফিন ঘিরে দলমত–নির্বিশেষে দাঁড়িয়েছিল অগণিত মানুষ। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো সেই কফিনে ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজা ঘিরে এ যেন জনতার মহাসমুদ্র। স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের ঢল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে উপচে পড়ে। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মানুষ জানাজায় অংশ নেয়। রাজনীতি–সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, এত বড় জানাজা, এত সম্মান, এত মানুষের আবেগতাড়িত উপস্থিতি বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি। কোনো রাজনীতিকের অন্তিম বিদায়ের এমন দৃশ্য আর কখনো দেখা যায়নি। দৈনিক বণিক বার্তাও বিশেষ মলাট করেছে। পুরো পাতাজুড়ে বেগম জিয়ার মৃত্যু উপলক্ষে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে। পরের পাতায় স্পেশাল মলাট স্টোরি করেছে। যার শিরোনাম- ‘‘অসামান্য খালেদা’’। আর মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করেছে- ‘’একটি কফিনের পেছনে বাংলাদেশ’’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেদিন ছিল ১৯৮১ সালের ২ জুন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজায় মানিক মিয়া এভিনিউ ও সংলগ্ন এলাকায় মানুষের ঢল নেমেছিল। অগণিত মানুষ এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাষ্ট্রনায়কের জানাজায় অংশ নেন। ৪৪ বছর পর তার স্ত্রীর জানাজায় গতকাল সে রকম একটি দিনের সাক্ষী হয়েছে ঢাকা। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে সারা দেশ থেকে জড়ো হয়েছিলেন অগণিত মানুষ। ঘুচে গিয়েছিল দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভেদ। সবাই সকাল থেকেই হাঁটছিলেন। গন্তব্য একটাই-মানিক মিয়া এভিনিউ। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়া আর তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে সবাই ছুটে এসেছিলেন। মানিক মিয়া এভিনিউ, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও আশপাশের এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। খালেদা জিয়ার কফিনের পেছনে যেন দাঁড়িয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। দৈনিক ইত্তেফাকও বিশেষ মলাট করেছে। পাতাজুড়ে বেগম জিয়ার জানাজার ছবি ছেপে লিখেছে- ‘‘জনমহাসমুদ্রের ভালোবাসায় সিক্ত খালেদা জিয়া’’। আর মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করেছে- ‘‘জনমহাসমুদ্রের ভালোবাসায় অন্তিম শয়ানে খালেদা জিয়া’’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনিক সমকাল ২টি বিশেষ মলাট করেছে। প্রথম মলাটের পুরো পাতাজুড়ে বেগম জিয়ার ছবি প্রকাশ করেছে লিখেছে ’‘গণমানুষের আস্থার বাতিঘর: দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, অনন্তলোকে অন্ততযাত্রা’’। পরের পাতায় ‘খালেদা জিয়ার মহাকাব্যিক বিদায়’ শিরোনামে পাতাজুড়ে ফটোস্টোরি প্রকাশ করেছে। আর দ্বিতীয় বিশেষ মলাটের শিরোনাম করেছে ‘‘শোক, শ্রদ্ধায় মহিমান্বিত বিদায়’’। মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করেছে- ‘‘রাষ্ট্র যেন সব মানুষের, সব ধর্মের হয়’’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনিক আজাদ নামে একটি পত্রিকা ছিল। সম্পাদক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। পাকিস্তান আন্দোলনে আজাদের বড় ভূমিকা ছিল। আজ প্রমাণিত হয়েছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আজাদের অবস্থান সংগত ছিল না। তবু তার ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যায় না। উপসম্পাদকীয় পাতায় নিজ অবস্থান পরিষ্কার করত। দৈনিক আজাদের প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানানোর সুযোগ নেই। তবু এর কিছু গুণের কথা অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানে এমন পত্রিকা নেই বললে চলে। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকটে গণমানুষের পাশে দাঁড়াবে, যথাযথ সংবাদ পরিবেশন করবে এবং উপসম্পাদকীয় বিভাগে নিজেদের আদর্শকে ভিত দান করবে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে– এমন মুখপত্র চাই, যেন রাষ্ট্রের বিপরীতে মানুষ কণ্ঠহীন হয়ে না পড়ে। নতুন বছরে অনেক চাওয়ার ভেতর এটি অন্যতম প্রধান। দেশে ইতিহাসের নানারকম ব্যাখ্যা থাকবে, কিন্তু উপাত্তগুলো স্বীকার করে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সংঘটন ও এর প্রয়োজনীয়তাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করে না নিলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় সংকট দেখা দেবে। যে কোনো কাঠামোকে দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় না করালে তার স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ভিতের ওপর রাষ্ট্র কাঠামোকে দাঁড় করাতে হবে। রাষ্ট্র যেন সব ধর্মের, সব সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর হয়, মানুষ যেন ভীতিহীন সামাজিক পরিবেশ পায়, বিচারহীনতার সুযোগে মানুষের ভেতরকার সহিংসতা ও মানুষকে অবমূল্যায়নের পাশবিক ঝোঁক যেন না জেগে ওঠে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে। দৈনিক যুগান্তরও বিশেষ মলাট করেছে। বেগম জিয়ার জানাজার ছবি ছেপে লিখেছে- ‘‘আপসহীন তোমায় বিদায়ি সালাম’’। আরও মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করেছে- ‘‘হাল ধরতে হবে তারেক রহমানকে’’। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবর্তমানে দেশের সর্বস্তরের মানুষের নজর এখন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে। শুধু বিএনপি নয়, দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার এখন তার কাঁধে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানকেই এখন হাল ধরতে হবে। কারণ দেশের রাজনীতিতে অপরাপর যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে বড় দল হিসাবে বিএনপি তথা তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। ফলে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এছাড়া দেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বড় একটা রাজনৈতিক শূন্যতাও তৈরি হয়েছে। এটা পূরণের জন্য এবং দেশের সামনে থাকা সংকটগুলো সমাধানের বিশাল ভার বিএনপি এবং তারেক রহমানের ওপর এসে পড়েছে। তবে তারেক রহমান ইতোমধ্যে সেই তার দায়িত্ব পালন অনেকটাই অনেকাংশে শুরু করে দিয়েছেন বলেও মনে করেন তারা। বিশেষ মলাট করেছে দৈনিক মানবজমিনও। বেগম জিয়ার জানাজার ছবি ছেপে লিখেছে- ‘‘শোকের মহাসমুদ্র’’। আরও মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করেছে- ‘‘বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত’’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে মরহুমের ছেলে তারেক রহমান মাকে কবরে শায়িত করেন। রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে সশস্ত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। দাফনের আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া এভিনিউ ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হয় বেগম জিয়ার ঐতিহাসিক জানাজা। এতে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। শোক আর শ্রদ্ধায় আপসহীন এই নেত্রীকে শেষ বিদায় জানান কোটি মানুষ। বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে জানাজার পর সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেয়া হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার কিছু পর বিশেষ একটি বাহনে করে মরদেহ বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও তার স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছে নেয়া হয়। সমাধির কাছাকাছি নেয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা।