অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, ঐক্যের ডাক পেজেশকিয়ানের

ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ঘিরে চলমান বিক্ষোভ তেহরানসহ একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে আধাসামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংলাপের আশ্বাস দিয়েছে। ঐক্যের ডাক দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। খবর আল জাজিরার।একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতের চাপে নুয়ে পড়ছে ইরানের অর্থনীতি। জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দর নেমে গেছে ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৩ লাখ ৯০ হাজারে। যা দেশটির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বনিম্ন মান। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই দেশটির অর্থনৈতিক পতনের মূল কারণ। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এবং এর প্রেক্ষিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত রোববার (২৮ ডিসেম্বর) রাস্তা নামেন তেহরানের ব্যবসায়ীরা। এরপর তা তেহরানের বাইরে কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ, কেরমানশাহসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভের মধ্যেই পদত্যাগ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান। এরপরও বিক্ষোভ থামেনি। বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) এই বিক্ষোভ চতুর্থদিনে গড়ায়। এদিন কোথাও কোথাও পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গের চেষ্টা চালায়। আরও পড়ুন: ট্রাম্পের ইরানে হামলার হুমকির জবাব দিলেন পেজেশকিয়ান দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে একটি স্থানীয় সরকারি ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। এ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এতে আধাসামরিক বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত ১৩ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বানের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের দাবি শোনার নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এদিন তেহরানে একটি ব্যবসায়িক ফোরামে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপই এই অস্থিরতার জন্য দায়ী। তার কথায়, ‘আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে আছি যেখানে দেশের শত্রুরা এবং দুর্ভাগ্যবশত দেশের ভেতরের একটি মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।’ ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশ এখন একটি ‘পূর্ণ-মাত্রার যুদ্ধ’-এ লিপ্ত। তার কথায়, ‘এই মুহূর্তে শত্রুরা অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে আমাদের ধ্বংসের চেষ্টা করছে।’ শত্রুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বোমা, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আপনি কোনো জাতিকে জয় করতে পারবেন না।’ ‘এবং যদি তারা মাটিতে এই জাতিকে মোকাবেলা করে, আমরা যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ঐক্যবদ্ধ এবং আমাদের দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে একসাথে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকি, তাহলে তাদের পক্ষে ইরানকে হাঁটু গেড়ে বসানো অসম্ভব হবে।’ আরও পড়ুন: পাল্টা জবাব ইরানের, কানাডার নৌবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা এর আগে গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে পেজেশকিয়ান জানান, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিক্ষোভকারীদের ‘যৌক্তিক দাবিগুলো’ শোনার নির্দেশ দিয়েছেন।  তিনি বলেন, ‘জনগণের দাবি যতোই কঠোর হোক আমরা তাদের সব কথা শুনবো। আমাদের বিশ্বাস, নাগরিকেরা যথেষ্ট ধৈর্যশীল। তাদের ওপর চাপ বাড়ছে বলেই তারা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন। সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব জনগণের দাবি শুনে সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।’  বিশ্লেষকরা বলছেন, মুদ্রার দরপতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তেল রফতানি সীমিত হয়ে যাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেন প্রায় বন্ধ। শক্তিশালী মুদ্রার প্রবাহ কমে যাওয়ায় অর্থনীতি শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায়। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও সংকট বাড়িয়েছে। আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক শেষে ইরানে হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের  বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাড়ানো হয়েছে সরকারি ব্যয়। ঘাটতি পূরণে ছাপানো হয়েছে অতিরিক্ত টাকা। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশের ওপরে। এই চাপ সরাসরি পড়েছে মানুষের জীবনে। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্রুতগতিতে। স্বাস্থ্য ও নিত্যপণ্যের খরচ নাগালের বাইরে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে। পরমাণু আলোচনা অচল। ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় বিনিয়োগও থমকে গেছে। মানুষ রিয়াল ছেড়ে ডলার ও সোনার দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংক খাত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের ওপর দ্রুত আস্থা কমছে বাসিন্দাদের। এই অনাস্থাই রিয়ালের পতনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বিশ্লেষকদের দাবি, অর্থনৈতিক দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে ইরান।