২০২৫ সাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল টালমাটাল, নাটকীয় ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের বছর। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার থেকে শুরু করে বড় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, ঐতিহাসিক বিচারিক রায়, দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচন এবং বছরের শেষ প্রান্তে জাতীয় রাজনীতির এক অধ্যায়ের সমাপ্তি, সব মিলিয়ে বছরজুড়ে রাজনীতি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিতবছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও দলটির নিবন্ধন স্থগিত। মে মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া জোরদার হয়। ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয় এবং ১২ মে চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-অঙ্গসংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই দিনে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।সংস্কার কমিশন ও রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্বিন্যাসরাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে ২০২৫ সাল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশন সারা বছর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত অসঙ্গতি দূর করতে এই কমিশনগুলো গঠন করে। কমিশনগুলো তিন দফায় মোট ৭২ দিন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চালায়। কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় প্রথম পর্যায়ে উত্থাপিত ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ৬৪টিতে ঐকমত্য হয়। পরবর্তী ধাপগুলোতে আরও কিছু বিষয়ে সমঝোতা গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কমিশনের প্রস্তাবিত সনদে মোট ২৮টি প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত হয়, যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫এই সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫’। প্রধান উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে স্বাক্ষরিত এই সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ এবং সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির মতো মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব আসে। সনদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা আর ফিরে না আনার অঙ্গীকার করে। এর আলোকে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সংশোধনের উদ্যোগও শুরু হয়।নতুন রাজনৈতিক শক্তি: এনসিপির উত্থান ও টানাপোড়েন২০২৫ সালে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানও আলোচনায় ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ‘শাপলা কলি’ প্রতীক পায়। তবে দল গঠনের পরপরই আসন সমঝোতা, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা এবং অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে এনসিপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। পরে এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে ৭ ডিসেম্বর গঠন করে গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট (ডিআরএ)। যদিও পরবর্তীতে সেই জোট থেকে বেরিয়ে জামায়াতসহ ইসলামপন্থীদের নির্বাচনী জোট যুক্ত হয় এনসিপি। আরও পড়ুন: ফিরে দেখা ২০২৫ /চলতি বছর নাটকে আলোচিত অভিনেতা কারা?নির্বাচনের রোডম্যাপ ও প্রস্তুতিনির্বাচনকে ঘিরেও ২০২৫ সাল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলো দ্রুত সংস্কার শেষ করে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানায়। বছরের শেষ দিকে সেই দাবির বাস্তবায়ন দেখা যায়। প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন ২৮ আগস্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ, নারী প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সংলাপ করে। রোডম্যাপ অনুযায়ী পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনসংক্রান্ত আইনের সংশোধনী কাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়।১৬ বছর পর ডাকসু নির্বাচনছাত্র রাজনীতিতেও ২০২৫ সাল ছিল ঐতিহাসিক। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। এই নির্বাচনে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। ভিপি নির্বাচিত হন সাদিক কায়েম, জিএস হন এস এম ফরহাদ এবং এজিএ হন সমহিউদ্দিন খান। ডাকসু ছাড়াও জাকসু, রাকসু, চকসুর মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছাত্র শিবিরের প্রার্থীদের জয়জয়কার ছিলো চোখে পড়ার মতো।শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর ঘটনা ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার ও রায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়। একই মামলায় দণ্ডিত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। এতে ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রায় ১৩ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রস্তুতিতে প্রবেশ করে।হাদি হত্যাকাণ্ডে রাজনীতি উত্তালডিসেম্বরে রাজনীতিকে নাড়িয়ে দেয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড। ১২ ডিসেম্বর মতিঝিল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয় এবং বিচার দাবিতে রাজপথে আন্দোলন জোরালো হয়।তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনবছরের শেষ প্রান্তে আরেকটি বড় ঘটনা ছিল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রবাস জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। তার আগমনকে ঘিরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে লাখো নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়, যা বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে।খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ২০২৫ সালের একেবারে শেষে এসে দেশের রাজনীতিতে নেমে আসে গভীর শোক। গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। তার মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, সংগ্রামী ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিবর্তন, সংঘাত, সংস্কার ও স্মরণীয় বিদায়ের এক ব্যতিক্রমী বছর।