যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠতে পারে ২০২৬ সাল। এ বছরই ডেভিড ক্যামেরনের ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ম বার্ষিকী পূর্ণ হবে। একই সঙ্গে, পাঁচ বছর পর্যালোচনার মুখে পড়বে বরিস জনসনের ২০২০ সালের বাণিজ্য ও সহযোগিতা চুক্তি, যার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বাজার, শুল্ক ইউনিয়ন ও অবাধ যাতায়াত ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়। এতদিন পর ব্রেক্সিট এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নিচের সারির ইস্যু হয়ে গেছে। বিষয়টি বিস্ময়কর, কারণ ২০১৬ সালের পর জনমত স্পষ্টভাবেই বদলেছে। ব্রেক্সিট নিয়ে বাড়তে থাকা হতাশাই ধারাবাহিকভাবে তিনজন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টির ভূমিধস বিজয়ের পথ তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিটবিরোধ মনোভাব নন-ট্যারিফ (অ-শুল্ক) বাধা বৃদ্ধির ফলে ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের পণ্য রপ্তানিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, পাশাপাশি সেবাখাতের রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাজেট দপ্তর অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, জিডিপি প্রায় চার শতাংশ কমবে—এই হিসাব এখনো বাস্তবসম্মত বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে ভোটারদের বড় অংশ সরাসরি মত বদলায়নি। বরং দুই ধরনের পরিবর্তনে ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে ভারসাম্য ঝুঁকেছে। একদিকে বয়সজনিত কারণে অনেক ‘লিভ’ সমর্থক ভোটার নেই, অন্যদিকে তরুণ ‘রিমেইন’ সমর্থকের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি, ২০১৬ সালে যারা সিদ্ধান্তহীন ছিলেন, তারা এখন বড় পরিসরে রিমেইনের পক্ষে ঝুঁকছেন। ফলে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন ব্রেক্সিট ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। তবুও ব্রেক্সিট পুরোপুরি উল্টে দেওয়া সহজ নয়। প্রথমত, ২০১৬ সালের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়। যুক্তরাজ্যকে নতুন করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে হবে, যেখানে রিফর্ম ইউকে ও কনজারভেটিভ পার্টির প্রবল বিরোধিতা থাকবে। আগের বিশেষ বাজেট ছাড়ও আর পাওয়া যাবে না, এমনকি ইউরো মুদ্রায় যোগ দেওয়ার চাপও আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই বদলে গেছে। পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে তারা আরও সক্রিয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ব্যবহার বেড়েছে এবং বড় বাজেটের সঙ্গে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে। তৃতীয়ত, ব্রেক্সিট নিয়ে আবারও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কে ফেরার আগ্রহ খুব কম। কী করবে যুক্তরাজ্য এমন বাস্তবতায় স্যার কিয়ার স্টারমারের সরকার বাস্তববাদী পথে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার কৌশল নিচ্ছে। ঋষি সুনাকের সময় উত্তর আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল সংশোধনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বর্তমান সরকার ইউরোপীয় খাদ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা এবং জ্বালানি ও পরিবেশগত নীতিতে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাণিজ্য বাধা আরও কমাতে চাইছে। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পক্ষে যুক্তি জোরদার করছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত দ্বিতীয় মেয়াদ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনও একই দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ কী বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্ক সম্পূর্ণ সদস্যপদে না গিয়েও নতুন ধরনের আংশিক সহযোগিতার দিকে যেতে পারে। সুইজারল্যান্ডের মতো মডেল বা খণ্ডিত অংশীদারত্বের ধারণা এখন আর ইউরোপের কাছে ততটা অগ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বমুখী সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে এই নমনীয়তা বাড়ছে। পেছন ফিরে তাকালে ২০১৬ সালের গণভোট হয়তো যুক্তরাজ্যের ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করেনি বলেই মনে হতে পারে। এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলাবে, কখনো যাবে অপ্রত্যাশিত দিকেও। তবে অন্তত সামনের কয়েক বছরে সেই পরিবর্তন দুই পক্ষকে দূরে নয়, বরং আরও কাছাকাছিই টেনে আনবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/