কালের বিবর্তনে একটি বছর বিলীন হয়ে উদয় হয়েছে নতুন সূর্য। নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা নিয়ে হাজির ২০২৬ সাল। সমাজের অন্য সেক্টরগুলোর মতো ক্রীড়াঙ্গনেও হিসাব মেলানোর পালা। কেমন ছিল বিদায়ী বছরের ক্রীড়াঙ্গন? কতটা সম্ভাবনাময় নতুন বছরটি? পুরোনোকে পেছনে ফেলে এখন নতুনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। বিদায়ী বছরে ক্রীড়াঙ্গনে যে সাফল্যগুলো এসেছে বাংলাদেশের সেটাকে আরো এগিয়ে নেওয়া এবং ব্যর্থতাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সাফল্যের পথে হাঁটাই হতে হবে নতুন বছরের অঙ্গীকার। নতুন বছরে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আছে। তার মধ্যে অবশ্যই সবচেয়ে আলোচিত ও আকর্ষণীয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই ইভেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নেই। বাছাই পর্বেই শেষ হয় বাংলাদেশের দৌড়। তবে বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে উন্মাদনা তৈরি হয় লাল-সবুজের দেশেও। ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে দেড় মাস মেতে থাকেন সমর্থক-ভক্তরা। এ বছর ১১ জুন শুরু হবে ফিফা বিশ্বকাপ। এই প্রথম বিশ্বকাপ হচ্ছে তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। ৪৮ দেশের বিশ্বকাপও এবারই প্রথম। মাঠে বাংলাদেশের উপস্থিতি না থাকলেও বিশ্বকাপ থাকে এ দেশের মানুষের হৃদয়জুড়ে। বিশ্বকাপ ছাড়া আরো অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আছে নতুন বছরে। সেগুলোতে প্রতিনিধিত্ব থাকবে লাল-সবুজ জার্সিপড়া ক্রীড়াবিদদের। বিশ্বকাপ ফুটবল সবাইকে আনন্দে ভাসিয়ে রাখলেও মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য বাংলাদেশেনর ক্রীড়াবিদেদের তাকিয়ে থাকতে হবে নিজেদের অংশগ্রহণের প্রতিযোগিতাগুলোর দিকে। নতুন বছরে ক্রিকেটের তিনটি বড় আসরে অংশ নেবে বাংলাদেশ। ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বসতে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এ বছর আছে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও। এছাড়া নতুন বছরে থাকছে অনূর্ধ্ব-১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। গত বছর জাতীয় ও অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল দল এশিয়া কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ইতিহাস গড়েছে। নতুন বছরে এশিয়ার মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার পালা আফঈদা-ঋতুপর্ণাদের। এশিয়ার সেরা ১২ দলের মধ্যে ঢুকেছে বাংলাদেশ। নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চে বাংলাদেশ কী করে, সেদিকেই দৃষ্টি থাকবে দেশের ক্রীড়ামোদীদের। আগামী ১ থেকে ২১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার তিন শহর সিডনি, পার্থ ও গোল্ডকোস্টে বসবে এএফসি নারী এশিয়ান কাপের আসর। ঋতুপর্ণা, আফঈদা আর মারিয়া মান্দারা বাছাই পর্বে মিয়ানমারকে টপকে এই যোগ্যতা অর্জন করেছেন। ফুটবলের এশিয়ার সর্বোচ্চ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ আগে একবারই খেলেছিল ১৯৮০ সালে। পুরুষ দলের সেই অংশহগ্রহণের পর আর কখনো যোগ্যতা অর্জন সম্ভব হয়নি। ৪৫ বছর পর মেয়েদের কল্যাণে আবার এশিয়ার সেরা মঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতি। এশিয়ার সেরা ১২ দলের প্রতিযোগিতায় কঠিন প্রতিপক্ষ পড়বে গ্রুপে, সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ ‘বি’ গ্রুপে পড়েছে চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তানের সাথে। এমন শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশ মাঠে কী করতে পারবে, সেটাই দেখার। তবে তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশ যদি নিজেদের সেরাটা দিয়ে চমক দেখাতে পারে, সেটাই হবে বিশাল ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এশিয়ান কাপ থেকে সুযোগ আছে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক ফুটবলের কোয়ালিফাইংয়ে খেলারও। তাই বাংলাদেশের মেয়েদের চোখ বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক গেমস বাছাইয়ে থাকবে। জাতীয় ফুটবল দলের পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপেও বাংলাদেশের মেয়েদের নিয়ে জ্বলছে আশার আলো। এশিয়ার সেরা ১২ দলের এই লড়াইয়ের আসর বসবে ১ থেকে ১৮ এপ্রিল থাইল্যান্ডে। এই বিভাগের এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ পড়েছে ‘এ’ গ্রুপে। এখানেও এক প্রতিপক্ষ চীন। স্বাগতিক থাইল্যান্ড আছে বাংলাদেশের গ্রুপে। অন্য দলটি ভিয়েতনাম। কঠিন লড়াই হবে অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপেও। সিনিয়র এশিয়ান কাপের মতো অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ থেকেও খেলার সুযোগ থাকবে অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে খেলার। জাতীয় দল ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের সাফল্য এসেছে এক কোচ আর এক অধিনায়কের নেতৃত্বে। ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার ও অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার প্রান্তির জন্যও এশিয়ান কাপ ও অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ অন্যরকম এক অনুভূতির হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস গড়া এই টুর্নামেন্ট দুটিতে ভালো কিছু করতে পারলে আরো পূর্ণতা পাবে সাফল্য। এটা ঠিক, এশিয়ার সবচেয়ে বড় আসরে বাংলাদেশ প্রথমবার অংশ নিয়ে বড় কিছু করা সম্ভব না। তবে বাংলাদশেরে মেয়েরা ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ান প্রতিযোগিতায়ও যে লড়াইয়ের সক্ষমতা তৈরি করেছে, তা প্রমাণ করে ফিরতে পারলেই আগামীতে আরো বড় স্বপ্ন দেখার পথ তীব্র হবে। দেশের ক্রীড়ামোদীরা প্রত্যাশা করছে পুরুষ ও নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও বাংলাদেশ ভালো ফলাফল করে ফিরুক। সেই সাথে ভালো ফলাফল করুক অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপেও। লিটন দাস, নিগার সুলতানা জ্যোতি আর আজিজুল হাকিম তামিমদের হাত ধরে নতুন বছরে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক আসর থেকে বাংলাদেশ সুমান কুড়িয়ে আনুক। দেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটের সাথে মানুষের আবেগ বেশি। ফুটবল দিন দিন পেছনে হাঁটার কারণেই দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। সেই ক্রিকেটের দুটি বিশ্বকাপ একই বছরে। তাই দেশের ক্রীড়ামোদীরা ক্রিকেট মাঠে নজর রাখবেন। ক্রিকেট মাঠের এখন বেশি আনন্দ ছড়ায় ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে। নতুন বছরে ক্রিকেটাররা ব্যাট-বলে আলো ছড়াবেন বলেই আশা সবার। দেশের তৃতীয় প্রধান খেলা হকিরও বিশাল অর্জন ছিল বিদায়ী বছরে। জুনিয়র বিশ্বকাপে খেলার মাধ্যমে দেশের হকি পা রাখে নতুন যুগে। হকির কোনো পর্যায়ের বিশ্বকাপে আগে বাংলাদেশ খেলেনি। তিন প্রধান খেলার মধ্যে ক্রিকেটেরই ছিল বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা। এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছে হকি। প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ৭টি দেশের সামনে থাকা বিশাল এক অর্জনই। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেমন দল হিসেবে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে, তেমন ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখিয়েছেন আমিরুল ইসলাম। বিকেএসপি ও মোহামেডানের এই ডিফেন্ডার চমকের পর চমক দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ৬ ম্যাচে ৫টি হ্যাটট্রিকসহ ১৮ গোল করে সর্বাধিক গোলদাতার পুরস্কারও জিতেছেন এই তরুণ ডিফেন্ডার। সামনে বাংলাদেশের সামনে এশিয়ান গেমসের বাছাই। সেখানেও আমিরুল-সামিনরা আলো ছাড়াবেন বলেও প্রত্যাশা করছেন সবাই। আছে অনূর্ধ্ব-২১ দলের এএইচএফ কাপও। অর্থাৎ নতুন বছরে হকিতেও নজর থাকবে ক্রীড়ামোদীদের। নতুন বছরে নতুন ইতিহাসও হতে পারে দেশের হকিতে। ফেডারেশন চেষ্টা করছে আগামী এশিয়ান গেমস হকির বাছাইয়ে নারী দলকেও খেলানোর। যদি বিওএ সম্মতি দেয় এবং বাংলাদেশ নারী হকি দল এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে খেলতে পারে তাহলে প্রথমবার জাতীয় দলের জার্সিতে হকির টার্ফে নামতে পারবেন মেয়েরা। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নারী হকিতে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেললেও এখনো জাতীয় দল তৈরি সম্ভব হয়নি। এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে খেলতে পারলে পূর্ণতা পাবে দেশের নারী হকিতে। যদি এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে খেলার সুযোগ পায় নারীরা তাহলে নতুন অধ্যায় যোগ হবে দেশের হকিতে। এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এশিয়ান গেমস আছে নতুন বছরে। জাপানের আইচি ও নাগোয়া শহরে এশিয়ান গেমস হবে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ আগস্ট। তার আগে কমনওয়েলথ গেমসের আসর বসবে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে। এ দুটি গেমস ছাড়া এ বছরে আছে এ বছর বাংলাদেশের কয়েকটি ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থাকবে। যেমন এবারই প্রথম আয়োজন হবে সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপ। ছেলে ও মেয়ে দুই গ্রুপেই অংশ নেবে বাংলাদেশ। খেলা হবে আগামী ১৩ থেকে ২৫ জানুয়ারি থাইল্যান্ডে। দক্ষিণ এশিয়ার ছেলে ও মেয়েদের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়ার কথা আছে এ বছরই। তবে দিনক্ষণ ও ভেন্যু এখনো ঠিক হয়নি। ছেলেদের এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ ও মেয়েদের এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়ান কাপের বাছাই আছে নতুন বছরে। গ্রুপিং চূড়ান্ত হওয়ার পর জানা যাবে বাংলাদেশকে কোথায় খেলতে হবে। জাতীয় ফুটবল দলের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তৃতীয় রাউন্ডের অবশিষ্ট ম্যাচটি হবে ৩১ মার্চ। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলতে হবে প্রতিপক্ষের মাঠে। বিদায়ী বছরে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে যে সাফল্য এসেছে তার ধারাবাহিকতা নতুন বছরে অব্যাহত থাকবে বলেই প্রত্যাশা করছেন সবাই। তবে সবই নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট খেলার কর্মকর্তারা কিভাবে পরিকল্পনা সাজান, তার ওপর। নতুন বছর ক্রীড়াক্ষেত্র কতটা সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে, সেটাই দেখার বিষয়। খেলার মাঠে ভালো পারফরম্যান্স করতে ট্রেনিংয়ের বিকল্প নেই। আর যদি আন্তর্জাতিক ময়দানে ভালো করতে হয়, তাহলে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি বেশি বেশি খেলার সুযোগও করে দিতে হবে ক্রীড়াবিদদের। কথায় আছে-যেমন গুড়, তেমন মিষ্টি। যদি ক্রীড়াবিদদের বেশি বেশি অনুশীলন ও খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের কাছে ভালো পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করা যায়। তাই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন বছরটিতে ক্রীড়াক্ষেত্র সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে-সবার চাওয়া সেটাই। আরআই/এমএমআর/এমএস