নতুন বছর মানেই বদলের একটা সময়। পুরোনোকে পেছনে রেখে সামনে এগোনোর সুযোগ। এই সাল বদল নিয়ে মানুষের মাঝে কাজ করে এক অদ্ভুত আবেগ অনুভূতির মিশ্রণ। ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধু একটি তারিখ বদলায় না; বদলে যায় আমাদের অপেক্ষা, সংকল্প, স্বপ্ন আর খানিকটা আত্মবিশ্বাসও। সেখানে থাকে পেছনে ফেলে যাওয়া দিনগুলোর হিসাব, সামনে আসা দিনের আশার আলো।কেউ পুরনো বছরের সেরা মুহূর্তগুলো মনে রাখে, কেউ আবার ভুলে যেতে চায় কিছু ক্লান্ত দিন। তবুও সবাই একই জায়গায় এসে মিলে যায়— নতুন বছর মানে নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির চারপাশেই গড়ে উঠেছে বহু পুরোনো, গল্পমাখা অসংখ্য রীতি, গান, উৎসব আর ঐতিহ্য। বহুদিন ধরে পালন করে আসা এসব রীতির পেছনের গল্পগুলো কত পুরোনো আর চমকপ্রদ হতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। চলুন সময়ের সিঁড়ি বেয়ে ঘুরে আসা যাক বিশ্বের এমনই জনপ্রিয় কিছু নিউ ইয়ার ঐতিহ্যের জন্মগল্পে— “টাইমস স্কয়ার বল ড্রপ”— নতুন বছরের সবচেয়ে বিখ্যাত মুহূর্ত নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে বিশাল ঝলমলে বল নেমে আসা— এ দৃশ্য ছাড়া যেন নিউ ইয়ার ভাবাই যায় না। কিন্তু এই বলের ইতিহাস শুরু হয়েছিল একেবারে ভিন্ন কারণে, সময় জানানোর জন্য। ১৮২৯ সালে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ বন্দরে প্রথম “টাইম বল” ব্যবহার হয়। ১৮৩৩ সালে গ্রিনউইচ মানমন্দিরেও একই বল স্থাপন করা হয়। দূর সমুদ্রের নাবিকরা ঘড়ির কাঁটা দেখার সুযোগ না পেলেও বল পড়ার সময় দেখে নির্ভুল সময় জানতে পারতেন। ১৮৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও নৌবাহিনীর মানমন্দিরে একটি টাইম বল স্থাপিত হয়। ১৯০২ সাল নাগাদ সান ফ্রান্সিসকো, বস্টন, এমনকি নেবরাস্কার ক্রিট শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভবনেও টাইম বল ব্যবহৃত হতো। তবে বৃষ্টি-ঝড়-হাওয়া মিলিয়ে অনেকসময় বল ঠিক সময়ে পড়ত না। পরে টেলিগ্রাফের আবিষ্কারে সময় মাপা আরও সহজ হয়ে যায় এবং টাইম বল ধীরে ধীরে ব্যবহার কমে যায়। ১৯০৭ সালে নিউইয়র্কে আতশবাজির নিষেধাজ্ঞা আসার পর নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার মালিক অ্যাডলফ অকস সিদ্ধান্ত নেন - পুরোনো ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে টাইমস টাওয়ারের চূড়ায় একটি ৭০০ পাউন্ড ওজনের কাঠ-লোহার বল স্থাপন করা হবে এবং সেটি সবার সামনে মাঝরাতে নিচে নামানো হবে। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯০৭ এর সেই রাত থেকেই শুরু হয় “বল ড্রপ”। সেই বলই ১৯০৮ সালকে স্বাগত জানায়। তারপর থেকে শত বছর ধরে এই রীতি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত নতুন বছরের অনুষ্ঠান হিসেবে চলে আসছে। “নিউ ইয়ার কাউন্টডাউন”— বছরের শেষ দশ সেকেন্ড আজকের সময়ে নতুন বছরের রাতে দশ থেকে এক গোনার সেই উত্তেজনাময় মুহূর্ত যেন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাত ছোঁয়, চারপাশে গুনগুনে ওঠে একই স্বর - “টেন! নাইন! এইট!”। মনে হয়, পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে নতুন শুরুকে ডাকছে। অথচ আজ যে কাউন্টডাউনকে আমরা আনন্দের প্রতীক মনে করি, তার জন্ম হয়েছিল ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা এক যুগে। ১৯৫০ এর দশকে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার আকাশে সারাক্ষণ ঝুলে থাকত পরমাণু বোমার আশঙ্কা। মানুষ জানত না কোন সকালে হঠাৎ শুরু হবে যুদ্ধ। তাই নতুন বছর মানেই ছিল শান্তির জন্য নতুন আশা। ঠিক এই পটভূমিতেই জন্ম নেয় আধুনিক নববর্ষ কাউন্টডাউন। ইতিহাসবিদ অ্যালেক্সিস ম্যাকক্রসেন দেখিয়েছেন, ১৯৫৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর, নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে প্রথমবার গণমাধ্যমে স্পষ্ট কাউন্টডাউন শোনা যায়। বল ড্রপ নামতে শুরু করলে রেডিও ধারাভাষ্যকার বেন গ্রাওয়ার গুণতে শুরু করেন - “৫৮ আসছে… ৫-৪-৩-২-১।” আর বলটি নিচে নামতেই ঘোষণা দিলেন, “এখন ১৯৫৮।” ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন শুরু হয় আজকের মতো নিউ ইয়ার কাউন্টডাউন উৎসব। এর আগেই আমেরিকা রকেট উৎক্ষেপণ আর বোমা পরীক্ষার ফলে কাউন্টডাউনের ভাষায় অভ্যস্ত ছিল। ১৯৪৭ সালের ডুমসডে ক্লক, ১৯৫৭ সালের আলফ্রেড হিচককের ফোর ও’ক্লক, আর ১৯২৯ সালের উম্যান ইন দ্য মুন - সবই প্রমাণ করে তখন জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও কাউন্টডাউনের ছায়া ছিল গভীর। তবু ১৯৫৭ সালের আগে জনসমক্ষে নববর্ষ কাউন্টডাউনের স্পষ্ট রেকর্ড নেই। জার্মানদের মধ্যরাতে নতুন বছর বরণ বা ওয়াচ নাইট প্রার্থনা ছিল, কিন্তু গলা মিলিয়ে সংখ্যা গোনার দৃশ্য দেখা যায়নি। পরের বছরগুলোতে বেন গ্রাওয়ারের প্রচার, আর ১৯৭০ এর দশকে ডিক ক্লার্কের New Year’s Rockin’ Eve - এর মাধ্যমে এটি আরও জনপ্রিয় হয়। সাধারণ মানুষের ভিড়ে একসঙ্গে কাউন্টডাউন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে, যখন টিভি-রেডিওর কল্যাণে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। আজ কাউন্টডাউন শুধু উৎসব নয় - রকেট লঞ্চ থেকে জন্মদিন, এমনকি নিউ ইয়র্কের ক্লাইমেট ক্লক - সব জায়গাতেই সময় গোনার এই রীতি জায়গা করে নিয়েছে। কারণ যেকোনো বড় পরিবর্তনের মুহূর্তেই মানুষ হিসাব করে শেষ কয়েক সেকেন্ডের। “ফায়ারওয়ার্কস” - আতশবাজি ও রঙের উৎসব নতুন বছরের রাতে কিংবা উৎসবের আকাশে যখন আতশবাজির ঝলমলে আলো ছড়িয়ে পড়ে, আমরা সবাই কল্পনা করি - এই উদযাপন কীভাবে শুরু হলো? সেই গল্পের শুরু প্রায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে, চীনের লিউয়াং শহরে। মানুষ তখন দেখেছিল, আগুনে বাঁশ ফেললেই শব্দ করে বিস্ফোরণ হয়। চীনারা বিশ্বাস করত, এই শব্দ অশুভ আত্মাকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। সেই সহজ বিস্ফোরণই ছিল ফায়ারওয়ার্কসের প্রথম জন্ম। তারপর সময় গড়িয়ে ৬০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময়ে এক চীনা রসায়নবিদ হঠাৎই মিশিয়ে ফেললেন পটাশিয়াম নাইট্রেট, সালফার আর কয়লা। জন্ম নিল ইতিহাসের প্রথম বারুদ। বাঁশ আর কাগজের নলের ভেতর সেই গুঁড়া ঢুকে তৈরি হলো মানুষের বানানো প্রথম ফায়ারওয়ার্কস - আলো, ধোঁয়া আর বিস্ময়ের এক নতুন মন্ত্র। ১৩ শতকে সেই জাদু পৌঁছায় ইউরোপে; ১৫ শতকে ইতালিরা ফায়ারওয়ার্কসকে রূপ দিল শিল্পে। রাজপ্রাসাদের ছাদে, উত্সবের মঞ্চে - আকাশ ভরে উঠত রঙিন আলোর অভিজাত খেলায়। এই আলো-উৎসব আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পৌঁছল নতুন দুনিয়ায়। প্রথম আমেরিকান বসতির সঙ্গে সঙ্গে ফায়ারওয়ার্কসও রইল তাঁদের রীতিতে। ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার প্রথম উদযাপনে আকাশে উঠল সেই আলো - যেমনটি জন অ্যাডামস স্বপ্ন দেখেছিলেন, “মিছিল, আগুন জ্বালা আর আলোকসজ্জায় মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত উদযাপিত হবে স্বাধীনতা।” এখনো প্রতি ৪ জুলাই সেই আলোয় ভরে ওঠে আমেরিকার আকাশ। অলিম্পিক, সুপার বোল - সারা বছরই বিভিন্ন উৎসবে এই আলো ফিরে আসে। উৎসবের সঙ্গে আসে অর্থনীতিও। আমেরিকার অন্যতম বড় প্রদর্শনী “থান্ডার ওভার লুইসভিল” স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রতি বছর দেয় ৫৬ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু টাকার হিসাবের বাইরে, ফায়ারওয়ার্কস যেন আমেরিকানদের হৃদয়ে স্বাধীনতার রঙ। তাই এখনো আমেরিকান পটাশিয়া অ্যাসোসিয়েশন আগলে রাখছে এই বহু শতকের ঐতিহ্য - আলো আর উল্লাসে ভরা এক চিরন্তন উৎসবের স্মৃতি। “অল্ড ল্যাং সাইন”— বন্ধুত্ব ও বিদায়ের গান নিউ ইয়ার’স ইভে ঠিক মধ্যরাতে যে গান সারা বিশ্বে একসঙ্গে গাওয়ার মাধ্যমে আবেগ ছড়ায়, তার শুরু কিন্তু আমেরিকায় নয়। গানটির জন্ম স্কটল্যান্ডে, ১৮শ শতকে। “Auld Lang Syne” - রবার্ট বার্নসের লেখা একটি কবিতা, যার অর্থ দাঁড়ায় “পুরোনো দিনের টানে”। পরে এটি স্কটিশ লোকসঙ্গীতের সুরে বাঁধা হয়। বার্নস দাবি করেছিলেন, তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষের মুখ থেকে গান শুনে কিছুটা সাজিয়ে লিখে নেন। যদিও সেই বুড়ো মানুষটির পরিচয় আজও অজানা। তবে ধারণা করা হয়, ১৭১১ সালে জেমস ওয়াটসনের “Old Long Syne” নামের একটি পুরোনো গানের কিছু অংশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে “Auld Lang Syne” - লেখা হয়। ১৮শ শতকের শেষ দিকে গানটি প্রথম জনপ্রিয় হয়। স্কটিশরা নতুন বছরের রাতে হাত ধরে বৃত্ত তৈরি করে গানটি গাইত। শেষ স্তবকে সবাই বুকের ওপর হাত গুঁজে পাশের মানুষের হাত ধরত, আর গান শেষে পুরো দল একসঙ্গে মাঝখানে এসে আবার ছড়িয়ে পড়ত - বন্ধুত্ব আর অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরার প্রতীক হিসেবে। পরে গানটি স্কটল্যান্ডের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ব্রিটেনজুড়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নববর্ষ মানেই “Auld Lang Syne” - তা গাওয়া হোক বা বাদ্যযন্ত্রে বাজানো হোক। একটি বছরকে বিদায় ও একটি নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সবচেয়ে আবেগী রীতি হয়ে ওঠে গানটি। স্কটল্যান্ডে বিয়ের অনুষ্ঠানে এবং ব্রিটেনের ট্রেড ইউনিয়নের বার্ষিক কংগ্রেসের শেষেও এটি বাজানো হয়। “নিউ ইয়ার রেজোলিউশন”— প্রতিশ্রুতির ইতিহাস নতুন বছরে নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা নতুন নয়। নতুন বছরের প্রথম দিনটি নিজের জীবনে কিছু বদল আনার প্রতিজ্ঞায় শুরু করার রীতির বয়স সভ্যতার বয়সের মতোই পুরোনো। ব্যাবিলনীয়রা প্রায় ৪০০০ বছর আগে ‘আকিতু’ নামে ১২ দিনের ধর্মীয় উৎসবে নতুন বা পুরোনো রাজার প্রতি আনুগত্যের প্রতিজ্ঞা করত। দেবতাদের খুশি করতে তারা ঋণ শোধ করার এবং ধার নেওয়া জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিত। রোমানরা নতুন বছরকে জানুস দেবতার প্রতি উৎসর্গ করত - যার দুটি মুখ, এক অতীতে, এক ভবিষ্যতে। তারা বিশ্বাস করত - বছরের প্রথম দিন যেমন কাটে, বাকি বছরও তেমনি কাটবে। তাই নতুন বছরের প্রথম দিন ছিল প্রতিজ্ঞা, উপহার ও নিজেকে ভালো রাখার শপথের দিন। খ্রিস্টধর্মেও রেজোলিউশন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। ইংরেজ ধর্মযাজক জন ওয়েসলি ১৭৪০ সালে প্রথম “ওয়াচ নাইট সার্ভিস” শুরু করেন - যেখানে মানুষ বছরের শেষ রাতে অতীত জীবনের ভুল-ত্রুটি বোঝার চেষ্টা করে এবং নতুনভাবে ভালো হওয়ার সংকল্প করে। বর্তমান যুগে রেজোলিউশন অনেকটাই ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। এক জরিপে দেখা যায়, মানুষের সবচেয়ে সাধারণ রেজোলিউশন হলো ওজন কমানো, আর্থিক অবস্থা ঠিক করা, মানসিক চাপ কমানো এবং নিজেকে আরও উন্নত করা। বিশ্বজুড়ে নতুন বছরের বিচিত্র উদযাপন পৃথিবীর নানা দেশ, নানা সংস্কৃতি - প্রতিটি জনপদই নিজেদের মতো করে বরণ করে নেয় নতুন বছরের প্রথম আলো। কারও ঘরে বাজি ফোটে, কারও রান্নাঘরে বিশেষ খাবারের ঘ্রাণ, কোথাও আবার মানুষের ভিড় জমে সৈকতে, মন্দিরে বা রাস্তার উচ্ছ্বাসে। নতুন বছরের উদযাপন আসলে মানুষ চিরকালই করেছে, তবে রীতি একেক অঞ্চলে একেক রকম। এমনই কিছু বিচিত্র উদযাপন সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক— গ্রিস-সাইপ্রাস: আলো নিভিয়ে কয়েনে ভাগ্য নির্ধারণ গ্রিস আর সাইপ্রাসে নতুন বছর মানেই ঘরে ঘরে তৈরি হয় “ভাসিলোপিতা” নামক কেক। কেকের ভেতর লুকানো থাকে একটি সোনালি কয়েন। ঠিক রাত ১২টায় ঘরের আলো নিভিয়ে সবাই মিলে সেই কেক কাটতে শুরু করে। যার ভাগ্যে সেই কয়েনটি পড়ে, তার নতুন বছর ভালো যাবে বলে বিশ্বাস করা হয়। চীন-ভিয়েতনাম-কোরিয়া: লাল আলো আর চন্দ্রবর্ষের শুভেচ্ছা কনফুসিয়াস-সংস্কৃতিভুক্ত দেশ চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়ায় নতুন বছর আসে সাধারণত ফেব্রুয়ারিতে, চন্দ্রবর্ষের সঙ্গে। সাধারণত একুশে জানুয়ারি থেকে বিশ ফেব্রুয়ারির মধ্যকার একটি দিনে শুরু হয় তাদের ‘চন্দ্রবর্ষ’। মোট বারটি প্রাণী থেকে প্রতি বছর একটি প্রাণীকে কেন্দ্র করে সাজানো হয় উৎসব। চীনের রাস্তাঘাট সাজে লাল লণ্ঠনে, ঘরে ঘরে ভালোবাসার বার্তা লেখা ঝুলতে থাকে দরজায়। নানান ধরন ও আকৃতির পাপেট ড্রাগনে ছেয়ে যায় শহর থেকে গ্রাম। হয় ড্রাগন নৃত্য। ১৯৯০ সাল থেকে চীনের মানুষ সপ্তাহব্যাপী ছুটি উপভোগ করে এই উৎসব পালনের জন্য। আর শিশুদের হাতে দেওয়া হয় লাল খাম “হংবাও”, যার ভেতরে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে থাকে টাকা। কোরিয়া আর ভিয়েতনামেও রয়েছে একই রঙিন আমেজ - পরিবারের সবাই একত্র হয়, প্রবীণদের প্রতি সম্মান জানায়, আর ভাতের কেক বা বিশেষ খাবারের মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। মুসলিম বিশ্বে হিজরি নববর্ষ: নীরব, আধ্যাত্মিক এক নতুন শুরু ইসলামিক নববর্ষ “মহররম” চাঁদের হিসাবে পালিত হয়, তাই প্রতি বছর তারিখ বদলায়। অনেক মুসলিমপ্রধান দেশে দিনটিতে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। এই উদযাপন বেশ শান্ত, নীরব আর ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে পালন করা হয়। মসজিদে বিশেষ দোয়া, আত্মসমালোচনা, আর নিজের জীবনে ভালো পরিবর্তন আনার অঙ্গীকারেই সাজে দিনটি। বাংলা নববর্ষ: বাঙালির লাল-সাদা উদযাপন বাংলা নববর্ষের পথচলা শুরু ষোড়শ শতকে, ১৫৫৬ সালে, যখন মুঘল সম্রাট আকবর কৃষি কর আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন তৈরি করান। সময়ের সাথে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মূল উৎসবে। আজ উদযাপনের রীতিই নববর্ষের আসল প্রাণ। ভোরে সূর্যোদয় দেখার পর থেকে শুরু হয় আনন্দের ঢেউ - রমনা বটমূলের গান, সাজানো রঙিন শোভাযাত্রা, মুখোশ, ঢাক-ঢোলের মাতাল তালে মঙ্গল শোভাযাত্রা; ঘরে-বাইরে পান্তা-ইলিশের গন্ধ; শিশু থেকে বয়স্ক সবার পরনে লাল-সাদা। শহর-গ্রামে মেলা বসে, গানের আসর জমে, আর মানুষ নতুন দিনের আশায় বলে “শুভ নববর্ষ”। বাংলা নববর্ষ শুধু তারিখ বদলের দিন নয় - এটা বাঙালির এক অনন্য সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের মুহূর্ত, যা চারশো বছরের ইতিহাস পাড়ি দিয়ে আজও একই রঙে, একই উচ্ছ্বাসে মানুষকে এক করে রাখে। স্কটল্যান্ড: ‘ফার্স্ট–ফুটিং’ - নতুন বছরের প্রথম অতিথিই সৌভাগ্য স্কটল্যান্ডে মধ্যরাতের পর কে প্রথম কারো দরজায় পা ফেলবে - এ নিয়ে চলে মজার দৌড়ঝাঁপ। যিনি প্রথম প্রবেশ করেন, তাকেই বাড়ির জন্য সৌভাগ্যের বাহক বলা হয়। অনেকে হাতে করে নিয়ে যান কয়লা, মিষ্টি বা ছোট কোনো উপহার - যেন নতুন বছরে ঘরে উষ্ণতা, মিষ্টতা আর সমৃদ্ধির দিন আসে। রোমানিয়া: নাচতে থাকা ‘ভালুক’ আর অশুভ তাড়ানোর রীতি রোমানিয়ার গ্রামাঞ্চলে নববর্ষের আগের রাতে দেখা যায় অদ্ভুত এক দৃশ্য - মানুষ ভালুকের মতো পোশাক পরে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে নাচতে নাচতে তাড়িয়ে দেয় ‘দুষ্ট আত্মাকে’। এই রীতির শেকড় বহু পুরনো - মানুষের বিশ্বাস ছিল ভালুক পবিত্র প্রাণী; তার উপস্থিতি অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকা: পুরোনো ফার্নিচার ছুড়ে ফেলা জোহানেসবার্গের কিছু এলাকায় নববর্ষ মানেই জানালা দিয়ে পুরোনো আসবাব ছুড়ে ফেলা। শুনতে আজব লাগলেও এর অর্থ খুব সরল- পুরোনো দুঃখ দুর্দশা ফেলে দিয়ে নতুন সুখকে জায়গা করে দেওয়ার প্রতীকী রীতি। ডেনমার্ক: থালা ভাঙলে আসে সৌভাগ্য যদি কারো রাগ জমে থাকে বা পুরনো ক্ষোভ মুছে দিতে চায়, ডেনমার্কে ঠিক সেই কাজ করা হয়। ড্যানিশরা বছরের পরিপূর্ণ পুরনো কাচের থালা, বাসনকোসন জমিয়ে রাখে। এরপর নতুন বছরের প্রথম মধ্যরাতে বন্ধু বা আত্মীয়ের বাড়ির দরজার সামনে এগুলো ছুঁড়ে ফেলে। সকালে যার দরজার সামনে যত বেশি ভাঙা টুকরো থাকে, তার তত বেশি সৌভাগ্য হবে বলে ধরে নেওয়া হয়। স্পেন: ১২ সেকেন্ডে ১২টি আঙ্গুর স্পেনে নতুন বছরের সময় সবার মুখে থাকে আঙ্গুর। পুরনো বছরের শেষ মুহূর্তে ১২ সেকেন্ডে ১২টি আঙ্গুর খেলে, নতুন বছরটা ভালো কাটবে বলে ধরা হয়। যে যত দ্রুত ও যত বেশি খেতে পারবে, তার ভাগ্য তত ভালো হবে। ফিলিপাইন: গোলাকার ১২টি ফলের জাদু ফিলিপাইনবাসীর নতুন বছর শুরু হয় গোলাকার জিনিস দিয়ে। তারা বছরে ১২ মাসের জন্য ১২টি গোলাকার ফল সংগ্রহ করে। কারণ তারা মনে করে, গোলাকার জিনিস, বিশেষত পয়সা - ধন-সম্পদের প্রতীক। যত বেশি গোলাকার জিনিস, তত বেশি সৌভাগ্য। জাপান: ১৮০ বার বেল বাজানো জাপানের কিওটো শহরে মধ্যরাতে ঠিক ১৮০ বার বেল বাজানো হয়। এই রীতি ‘জয়া নো কানে’ নামে পরিচিত। বিশ্বাস করা হয়, বেল বাজালে মন, আত্মার সব খারাপ ভাব ও দুঃখ ঝরে যায়। একে নতুন বছরের জন্য মন এবং মনোবল পরিষ্কার করার চিহ্ন মনে করা হয়। ইকুয়েডর: কাকতাড়ুয়া পোড়ানো ইকুয়েডরে নতুন বছরের রাত মানেই কাকতাড়ুয়া পোড়ানো। পরিবারের সবাই মিলে কাকতাড়ুয়া বানিয়ে রাত ১২টায় আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে পুরনো বছরের অশুভতা মুছে যায় এবং নতুন বছর সৌভাগ্য নিয়ে আসে। ব্রাজিল: অন্তর্বাসের রঙে ভাগ্য ব্রাজিলে নতুন বছরের প্রথম দিন রঙ বেরঙের অন্তর্বাস পরে মানুষজন। অন্তর্বাসের রঙ সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করে তারা। লাল অন্তর্বাস পরলে প্রেম আসে, হলুদ পরলে অর্থ লাভ হয়। আর্জেন্টিনা: জানালা দিয়ে কাগজ ছোঁড়া বুয়েনস এইরেসে ৩১ ডিসেম্বর দুপুরে শহর জুড়ে দেখা যায় রঙিন কাগজ ও কনফেত্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর্জেন্টাইনরা তাদের পুরনো দলিলপত্র, কাগজ জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে, যেন অতীতের দুঃখ নতুন বছরে না আসে। লাতিন আমেরিকার কিছু দেশের বাসিন্দারা ভালোবাসে জানালা দিয়ে পানির বালতি ছুড়ে ফেলতে। এটি নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রতীক। থাইল্যান্ড: তিন দিনের জলযুদ্ধ থাইল্যান্ডে নতুন বছর শুরু হয় ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিল, আর এই সোংক্রান উৎসবকে বলা হয় বছরের সবচেয়ে মজার জলউৎসব। তিন দিন ধরে রাস্তাজুড়ে সবাই একে অপরকে পানি ছুঁড়ে ভিজিয়ে দেয়। এই ভিজিয়ে দেওয়া থাইদের কাছে মজা নয়, বরং শুভকামনা জানানোর এক বিশেষ রীতি। তাদের বিশ্বাস, কারও ওপর পানি ঢাললে গত বছরের দুর্ভাগ্য ধুয়ে যায় এবং নতুন বছর ভালো কাটে। তাই সোংক্রান এলেই থাইল্যান্ডের পথে-ঘাটে পানি ছিটাতে ছিটাতে সবাই নতুন শুরুকে স্বাগত জানায়। রাশিয়া: নতুন বছরই যেন বড়দিনের উৎসব রাশিয়ায় নববর্ষের রাত দেখলে মনে হবে বড়দিন যেন একটু দেরিতে এসেছে। সাজানো গাছ, আলো ঝলমল বাড়ি, জাঁকজমক খাবারের টেবিল আর উপহার বিনিময়ের রীতি - সবই আছে। আর থাকে লাল পোশাকে হাসিমুখ বৃদ্ধ সান্তা ক্লজের মতোই “ডেড মোরোজ” নামক চরিত্র। সোভিয়েত আমলে ধর্মীয় উৎসব নিষিদ্ধ হওয়ায় বড়দিনের আনন্দই সরে এসেছিল নতুন বছরের রাতে - এখনও যা রাশিয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল উত্সব হিসেবে পালিত হয়। নতুন বছরের ঐতিহ্য - সময়ের সাথে আমাদের বন্ধনের গল্প নতুন বছর আসলে শুধু ক্যালেন্ডারের পালাবদল নয়। এটা মানুষের নিজের সঙ্গে, নিজের সময়ের সঙ্গে নতুনভাবে মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত। তাই তো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেসব রীতি গড়ে উঠেছে - ফায়ারওয়ার্কসের আলো, শেষ সেকেন্ডের কাউন্টডাউন, টাইমস স্কয়ারের ঝলমলে বল ড্রপ, “অল্ড ল্যাং সাইন” গানের টান, কিংবা নিজের কাছে দেওয়া ছোট্ট প্রতিজ্ঞা - সবকিছুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে সময়কে সম্মান জানানোর সেই সহজ মানবিক অনুভূতি। আমরা জানি সময় থেমে থাকে না। তবু ঠিক বছরের শেষ রাতে, শেষ মুহূর্তে সবাই যেন থেমে যায়। যেন সবাই নিজের ভেতরে একটু ফিরে তাকাই - কী হারালাম, কী পেলাম, আর কী রেখে গেল পুরনো বছর। এরপর নতুন বছরের দরজা খুলে যেতেই আমরা পুরনো ভুল আর থেমে থাকা স্বপ্নগুলো পিছনে ফেলে নতুন গল্পের দিকে পা বাড়াই। নতুন বছরের প্রতিটি রীতি - হোক প্রতিজ্ঞা করা, আলো জ্বালানো, বা সঙ্গীতে গলা মেলানো - আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি কথাই: প্রতিটি শেষের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি নতুন শুরু। আর মানুষ সেই শুরুটাকে আঁকড়ে ধরতে চায়, নিজের মতো করে সাজাতে চায়, আর সাহস করে বলে - এই বছরটায় সব হবে নতুন করে। শেষ পর্যন্ত নতুন বছর আসলে একটাই কথা শেখায় - জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ভাঙা স্বপ্ন আর প্রতিটি শেষ সেকেন্ডও আগামী দিনের সম্ভাবনার পথ খুলে দেয়। আর ঠিক সেইখানেই নতুন বছরের সবচেয়ে সুন্দর চমক - নতুন হয়ে ওঠার অবিরাম আহ্বান।