সিলেটবাসীর জন্য যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম রেলপথ। তবে আনন্দের পরিবর্তে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছে ট্রেনযাত্রা। টিকিট সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ইঞ্জিন ত্রুটিসহ নানা সংকটে প্রতিনিয়ত ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। এতে করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এই অঞ্চলের যাত্রী ও আগত পর্যটকদের। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রাত ১০টায় উপবন এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে আশার কথা থাকলেও গত কয়েকদিন ধরে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩-৪ ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকায় আসে উপবন এক্সপ্রেস। সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল রাত ১২টায়। তবে ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় কোনোভাবেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিকল্প ইঞ্জিন দিতে পারেনি। পরে যাত্রীরা আন্দোলন করলে রাত আড়াইটায় পারাবত এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন দিয়ে উপবন এক্সপ্রেস ছেড়ে আসে সিলেটে উদ্দেশে। কিছুদিন ধরে একই ঘটনা ঘটছে বলে জানান যাত্রীরা। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার জন্য শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে অতিরিক্ত ইঞ্জিন নেই। যেগুলো আছে এগুলো মেরামত করে চলতে হয়। এজন্য একটি ইঞ্জিন নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবর্তে অন্য ইঞ্জিন দেওয়া যায় না। এজন্য উপবন এক্সপ্রেস দেরিতে ছেড়ে এসেছে আবার দেরিতে ঢাকা থেকে ছেড়ে যেতে হয়েছে। একটি ইঞ্জিনকে ওয়াশ করে কয়েক ঘণ্টা রেস্ট দিতে হয়। সূত্র আরও জানায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলে। এর মধ্যে চারটি ট্রেন সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রামে চলাচল করে। এই ছয়টি ট্রেনই শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া হয়ে সিলেট স্টেশনে যায়। এছাড়া শমশেরনগর ও ভানুগাছ স্টেশন রয়েছে। তবে বেশি যাত্রী ও পর্যটক ওঠেন শ্রীমঙ্গল ও সিলেট থেকে। কিন্তু স্টেশনগুলোয় চাহিদার তুলনায় টিকিটের বরাদ্দ অপ্রতুল। স্থানীয় সূত্র বলছে, সিলেটবাসীর জন্য ট্রেনযাত্রা এখন ভোগান্তির কারণ। প্রতিদিন বিলম্বে ছেড়ে যায়। লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি এলাকায় উঁচু টিলায় ট্রেন আটকে থাকে। টিকিটের অভাবে স্থানীয় যাত্রীরা খুব একটা ট্রেনে যাতায়াত করতে পারেন না। স্টেশনে গেলেই শোনা যায়, টিকিট নেই। অবকাঠামো উন্নয়নের অভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। বৃটিশ আমলে রেললাইন নির্মাণ করা হলেও এরপর আর বড় কোনো উন্নয়ন হয়নি। সিলেটের কয়েকটি স্টেশন ঘুরে জানা যায়, শত বছর আগে ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলের রেললাইন চালু হয়। সেসময় ব্রিটিশরা এ অঞ্চলের চা ও অন্যান্য পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করতেন রেলপথে। ট্রেন ভ্রমণ আরামদায়ক হওয়ায় পরে যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বৃটিশ আমলে রেলপথে ভালোভাবেই চলেছে ট্রেন। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে অবস্থা বেহাল হয়েছে। জাকির হোসেন ও সাজিদ মিয়া নামে দুজন ট্রেনের যাত্রী বলেন, ‘রাতের ট্রেন সকালে ছাড়া হয়েছে। আমাদেরকে এসএমএস দিয়ে নিদিষ্ট সময় জানালে আমরা সময়মতো আসতাম।’ তারা আরও বলেন, ‘ট্রেনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। সিলেট অঞ্চলের প্রতিটি টেনের ইঞ্জিন দুর্বল। এগুলো পরিবর্তন করা খুবই জরুরি।’ এ বিষয়ে কুলাউড়া স্টেশনের মাস্টার রুমান আহমেদ বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে কয়েকটি ট্রেন বিলম্ব করছে। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। ঘন কুয়াশা, দুর্বল ইঞ্জিন এসব কারণে ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে আমরা কোনোভাবেই টিকিটের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। যাত্রীর তুলনায় অতি সামান্য টিকিট রয়েছে।’ বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) মো. সজিব আল হাসান বলেন, ‘একটা ইঞ্জিন আসার পর আবার যেতে হয়। আমাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো ট্রেনের ইঞ্জিন নেই। বিকল্প হিসেবে আমরা দিতে পারি না। সিলেট অঞ্চলে সব ইঞ্জিন যেতে পারে না। পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে আটকা পড়ে। উপবনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় গত দুদিন বিলম্ব হয়েছে।’ এম ইসলাম/এসআর/এমএস