কেন বারবার টার্গেটে ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট?

নর্থ ইংল্যান্ডের প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি আবারও ফুঁসে উঠেছেন। ‘আবার’ শব্দটা কেন বললাম—কারণ, শুধু এ বছরেই নয়, বারবারই তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে সভা-সমাবেশ করতে হচ্ছে। দাবি একটাই: “লাভজনক ম্যানচেস্টার–সিলেট সরাসরি ফ্লাইটটি বন্ধ করা যাবে না।” গ্রেটার ম্যানচেস্টার, লিভারপুল, লিডস, ইয়র্কশায়ার, বার্মিংহাম ও স্কটল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি কমিউনিটি ইতোমধ্যেই সংগঠিতভাবে সরকারের কাছে আল্টিমেটাম দিয়েছে। হাইকমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ মহলে স্মারকলিপি দেওয়া শুরু হয়েছে। গত ২৯ ডিসেম্বর ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনারের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে অংশ নেন ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানীয় কাউন্সিলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। এবার এই আন্দোলনের প্রথম সারিতে রয়েছেন নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডের স্থানীয় প্রশাসনে নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত  কাউন্সিলার ও মেয়ররা—যা এই আন্দোলনকে শুধু প্রবাসী ক্ষোভ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও নাগরিক দাবিতে রূপ দিয়েছে। ওল্ডহ্যাম কাউন্সিলের সাবেক মেয়র ও বর্তমান ডেপুটি লিডার কাউন্সিলার আব্দুল জব্বারের আহ্বানে ৩০টিরও বেশি সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশ হাই কমিশনে এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং সরকারের প্রতিনিধির(সহকারী হাইকমিশনার) সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তাঁরা এ বিষয়টা সরকারের গোচরে আনার জন্য একটা স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ওয়ারিংটন কাউন্সিলের মেয়র মোয়াজ্জেম হোসেন, টেমসাইড কাউন্সিলের মেয়র শিবলি আলম, নির্বাচিত কাউন্সিলার, নর্থ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ সহ শতাধিক মানুষ। ২. হঠাৎ টিকিটিং সিস্টেম ‘ব্লকড’—কাকতালীয় নাকি পরিকল্পনা? উদ্বেগের মূল কারণ—হঠাৎ করেই বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ সিলেট–ম্যানচেস্টার রুটের টিকিটিং সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে কোনো টিকিট বুকিং নেওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই রুটে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে প্রায় ৫ হাজার প্রবাসী রিটার্ন টিকিট নিয়ে দেশে গেছেন। তাদের ভবিষ্যৎ ফিরে আসা নিয়েও একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এটাই প্রথম নয়। গত বছর ২৭ এপ্রিলের পরও একইভাবে অনলাইনে টিকিট বিক্রি বন্ধ করা হয়েছিল—কোনো ঘোষণা ছাড়াই। কার্যত তখন থেকেই ফ্লাইট বন্ধের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছিল। এবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যখন প্রফিট কিংবা লাভ আসছে, তখন কেন বন্ধের এই তৎপরতা? নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশিদের এই প্রতিবাদ সময়োপযোগী। এখন প্রয়োজন—বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক সমাজের স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে এই রুটটি বাঁচাতে এগিয়ে আসা। কারণ, রাষ্ট্রীয়ভাবে লাভজনক এবং কমিউনিটির জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অত্যাবশ্যকীয় এই ফ্লাইট বন্ধ করে আসলে কাকে রক্ষা করা হচ্ছে? সবচেয়ে বিস্ময়কর অথচ সত্যি কথা হলো—এই রুটটি লাভজনক। আন্দোলনের মুখে গত আগস্টে ফ্লাইট পুনরায় চালু হলে শুধু আগস্ট মাসেই প্রায় এক কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে। এরপর থেকে প্রতি মাসেই লাভের অঙ্ক বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম অর্থবছরে (২০২০–২১) যেখানে ক্ষতি ছিল ৮৩ কোটির বেশি, দ্বিতীয় বছরে তা নেমে আসে ৪০ কোটিতে, তৃতীয় বছরে ২০ কোটির নিচে। অর্থাৎ খুব দ্রুতই এই রুট ‘ব্রেক-ইভেন’-এর দিকেই এগোয়। অন্যদিকে, বিমানের ২১টি আন্তর্জাতিক রুটের মধ্যে অন্তত ১৪টি এখনো লোকসানে—রোম, নারিতা, গুয়াংজু রুট তার উদাহরণ। সেগুলো রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিতে চালু রাখা হলেও লাভের মুখ দেখা ম্যানচেস্টার–সিলেট রুটই কেন বারবার বন্ধের মুখে পড়ে? অথচ এই রুটের লভ্যাংশ মিলেই গত অর্থবছরে(২০২৪-২৫) বিমান প্রফিট করেছে ৭৮৫ কোটি টাকা। লাভ এবং যাত্রী চাহিদা বিবেচনা করেই আরও ১৪টি বিমান ক্রয়ের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে বিমান পরিচালনা পর্ষদ। ৩. কার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত? ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ বলে একটা কথা আছে- ব্রিটেনের কিছু রাঘব-বোয়াল ট্রাভেলস ব্যবসায়ীরা আছেন, তারা চান না এ ফ্লাইটটি চালু থাকুক। তাইতো সব সময়ই এ ফ্লাইটের লাভজনক সময়ে এসে এরা এর বিরোধিতায় মেতে উঠে, এর জন্য এরা বিমানের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডের মানুষ। ডেপুটি লিডার কাউন্সিলার আব্দুল জব্বার জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও আশানুরূপ সাড়া পাননি বলে জানিয়েছেন। চাপটা অব্যাহত রাখতে ‘সেভ ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট’ নামে একটি ব্যাপক জনসংযোগ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আর সেজন্য বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি মানুষের পক্ষ থেকে সরকারকে দাবি জানানো অর্থাৎ প্রেশারটা জরুরি হয়ে পড়েছে। ৪. শুধু ফ্লাইট নয়, এটি অর্থনীতি ও মর্যাদার প্রশ্ন এই ফ্লাইট শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়। একজন প্রবাসী যখন পরিবার নিয়ে দেশে যান, তখন টিকিটের মূল্যের চার গুণ অর্থ তিনি দেশে ব্যয় করেন—পর্যটন, চিকিৎসা, কেনাকাটা ও আত্মীয়স্বজনের পেছনে। এটি সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমান সব রুটে সমান লাভ করবে—এটা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু যেখানে লাভের স্পষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার অভাবে যদি ফ্লাইট বন্ধ করা হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রবাসীদের নয়—রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, বাংলাদেশের এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে আরও গতিশীল করতে বিমানের অফিসের চেয়েও বেশি জনসংযোগ করে থাকে স্থানীয় বাংলাদেশিরা, বিভিন্ন জায়গায়। ৫. নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত কেন? ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রত্যাশিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশগ্রহণ করছেন। ম্যানচেষ্টার-সিলেট ফ্লাইটে মূলত এ এলাকার প্রবাসীরাই যাতায়াত করে থাকনে। লন্ডন প্রবাসী বিএনপির দুজন রাজনৈতিক নেতাও এতে প্রভাবশালী প্রার্থী। প্রশ্ন উঠছে—নতুন সরকার আসার ঠিক আগে, কেন ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই এই লাভজনক রুট বন্ধের আয়োজন এত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠল? এই প্রশ্ন শুধু নর্থ ইংল্যান্ডের নয়—পুরো দেশেরই হওয়া উচিত। ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট টিকে থাকলে উপকৃত হবে প্রবাসী, লাভবান হবে রাষ্ট্র, শক্তিশালী হবে দেশের ভাবমূর্তি। এই রুট বন্ধের প্রতিবাদ তাই শুধু প্রবাসী আবেগ নয়—এটি একটি যৌক্তিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের দাবি। নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশিদের এই প্রতিবাদ সময়োপযোগী। এখন প্রয়োজন—বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক সমাজের স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে এই রুটটি বাঁচাতে এগিয়ে আসা। কারণ, রাষ্ট্রীয়ভাবে লাভজনক এবং কমিউনিটির জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অত্যাবশ্যকীয় এই ফ্লাইট বন্ধ করে আসলে কাকে রক্ষা করা হচ্ছে? লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট। এইচআর/জেআইএম