বাঙালি বিয়েতে গায়েহলুদ, এই রীতির ইতিহাস কী জানেন?

বাঙালি বিয়ের আয়োজন মানেই মেহেন্দি, গায়েহলুদ, হলুদ গোসল, বিয়ে, বৌভাত। এসব রীতিনীতি আজকের নয়, হাজার হাজার বছর ধরে বিয়ের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। বিভিন্ন অঞ্চল বা দেশ থেকে এসব রীতিনীতি বাংলায় এসেছে ব্রিটিশ, মিশর, পারস্যের মানুষদের হাত ধরে। বিয়ের আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে গায়েহলুদ। নব্বই দশকে এই আয়োজন যেমন হতো তার থেকে এখন কিছুটা ভিন্ন। আগে বিয়েরদিন সকালেই বর-কনেকে যার যার বাড়িতে বাড়ির মা-চাচি, খালা, বোন, নানি-দাদিরা হলুদ গায়ে মেখে গোসল করাতেন। বিভিন্ন ধরনের গীত গাইতেন, নাচ-গান করতেন। তবে এখন এই আয়োজন সাধারণত করা হয় সন্ধ্যার পর এবং বিয়ের এক বা দুদিন আগে। এখানে বর-কনেকে একসঙ্গে কিংবা আলাদাভাবে নিজ নিজ বাড়িতে হলুদ ছোঁয়ানো, খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গান, ছবি তোলা, আড্ডা এসবের মধ্য দিয়ে আনন্দ করা হয়। এই যে নিয়ম বা আয়োজনের খানিকটা তফাত হলেও এর জনপ্রিয়তা এবং গুরুত্ব কোনোটিই কিন্তু এতটুকু কমেনি। ইতিহাসে দেখা যায়, এই প্রথার মূল উৎস স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য সংক্রান্ত। প্রাচীনকাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সমাজে হলুদ বা হলুদ জাতীয় মসলা বিশেষ করে হালদি বা হলুদের ব্যবহার করা হতো ত্বক পরিষ্কার রাখা, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া রোধ করা, এবং রোদে ও বাতাসে বের হওয়া দূষণ থেকে ত্বককে রক্ষা করার জন্য। তাই গায়েহলুদ কেবল আভিজাত্যপূর্ণ অনুষ্ঠান নয়, বরং কনের ত্বকের স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির জন্য প্রাচীন প্রথাগত চিকিৎসা ভাবনার প্রতিফলন। সামাজিক দিক থেকেও গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এটি কনের ও বর পক্ষের পরিবারের মধ্যে মিলন ও আনন্দ উদযাপনের মাধ্যম। অনুষ্ঠানটি সাধারণত গান, নাচ, হাসি-ঠাট্টা এবং রঙিন সাজ-সজ্জার সঙ্গে পালিত হয়। পল্লী অঞ্চলে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন সকলে মিলে কনের হাতে হলুদের প্যাকেট ব্যবহার করে মাখন ও হলুদ মিশিয়ে তার ত্বককে উজ্জ্বল করার কাজ করেন। এই প্রথা কেবল আনন্দই দেয় না, বরং সামাজিক বন্ধন শক্ত করার একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের নেপথ্যে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার প্রতিফলনও রয়েছে। হলুদের হলুদ রংকে সততা, উজ্জ্বলতা এবং শুভতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। বিয়ের পূর্বে কনের শরীরে এই রঙের প্রয়োগ একরকম শুভ প্রেরণা ও সৌভাগ্যের আশ্বাস হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানটি কনের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত, যাতে সে নতুন জীবনের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী ও আনন্দময় থাকে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, গায়েহলুদ প্রথা মূলত মুসলিম, হিন্দু এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংমিশ্রিত সংস্কৃতির একটি ফলাফল। প্রাচীন হিন্দু বিয়ের প্রথায় হলুদ ব্যবহারের সূত্র ধরা যায়, যেখানে কনের ত্বক ও চেহারাকে শুভ রঙে আচ্ছাদিত করার রীতি ছিল। মুসলিম সমাজেও ধীরে ধীরে এই অনুষ্ঠান গ্রহণ করে, যেখানে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রথার সঙ্গে মিলিত হয়ে তা আধুনিক বাঙালি গায়ের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। বর্তমান কালে গায়েহলুদ শুধু স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য বা সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমই নয়; এটি বাঙালি বিয়ের একটি আবেগপূর্ণ ও ভিজ্যুয়াল আকর্ষণও। কনের রঙিন সাজ, হলুদ-কমলা পোশাক, ফুলের মালা, গান এবং পারিবারিক মিলন সব মিলিয়ে এটি বাঙালি বিয়ের স্মরণীয় ও প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে ফটোশুট ও সামাজিক মাধ্যমে গায়েহলুদকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। গায়েহলুদ অনুষ্ঠান প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, সামাজিক বন্ধন এবং শুভতার প্রতীক হিসেবে বাঙালি বিয়ের অভিন্ন অংশ। এটি কেবল কনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও জীবন্ত রাখে। প্রথাটি প্রমাণ করে যে, বাঙালি সমাজে বিয়ের আগের প্রস্তুতি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, বরং একটি আনন্দময়, সুস্থ ও মিলনমুখর সামাজিক রীতি হিসেবে গড়ে উঠেছে। আরও পড়ুনগ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের আয়োজন কি হারাতে বসেছেযেখানে সবাই মেলায় জীবনসঙ্গী খোঁজে, বিয়ের আগেই মা হয় মেয়েরা কেএসকে/এএসএম