এআইয়ের ‘ভুল’ তথ্য নিয়ে উদ্বেগ, ঝুঁকিতে মানুষ

গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি সংক্ষিপ্ত তথ্যসার বা এআই ওভারভিউতে থাকা ভুল ও বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য মানুষের জন্য ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে। এমন তথ্য উঠে এসেছে দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানে। গুগল জানিয়েছে, তাদের এআই ওভারভিউ একটি বিষয় বা প্রশ্ন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয় এবং এটি সহায়ক ও নির্ভরযোগ্য। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সার্চ ফলাফলের শীর্ষে দেখানো এসব সারাংশে অনেক ক্ষেত্রে ভুল স্বাস্থ্য তথ্য দেওয়া হচ্ছে, যা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। একটি ঘটনায়, বিশেষজ্ঞরা যাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করেছেন, সেখানে গুগল অগ্ন্যাশয়ের (প্যানক্রিয়াটিক) ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্পূর্ণ ভুল পরামর্শ; বরং ঠিক উল্টোটা করা উচিত। এমন ভুল তথ্য রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে। আরেকটি উদ্বেগজনক ঘটনায়, লিভারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারিতা পরীক্ষার বিষয়ে ভুয়া তথ্য দেখানো হয়, যার ফলে গুরুতর লিভার রোগে আক্রান্ত কেউ নিজেকে সুস্থ মনে করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নারীদের ক্যানসার পরীক্ষাসংক্রান্ত গুগল অনুসন্ধানেও সম্পূর্ণ ভুল তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে মানুষ প্রকৃত উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে উপেক্ষা করতে পারে। এই অনুসন্ধান এমন এক সময়ে প্রকাশ পেল, যখন এআই-নির্ভর তথ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক ব্যবহারকারী এসব তথ্যকে নির্ভরযোগ্য ধরে নিচ্ছেন। গত বছরের নভেম্বরে এক গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের এআই চ্যাটবট ভুল আর্থিক পরামর্শ দিচ্ছে। একই ধরনের উদ্বেগ সংবাদ সারাংশ নিয়েও প্রকাশ করা হয়েছে। দাতব্য সংস্থা মেরি কিউরির ডিজিটাল পরিচালক স্টেফানি পার্কার বলেন, মানুষ উদ্বেগ ও সংকটের সময়ে ইন্টারনেটের দ্বারস্থ হয়। যদি তখন তারা ভুল বা প্রেক্ষাপটহীন তথ্য পায়, তাহলে তা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংগঠন, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করার পর দ্য গার্ডিয়ান গুগলের এআই ওভারভিউয়ে একাধিক ভুল স্বাস্থ্য তথ্যের উদাহরণ খুঁজে পায়। প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার ইউকের সহায়তা, গবেষণা ও নীতিপ্রভাব বিভাগের পরিচালক আনা জুয়েল বলেন, রোগীদের উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ সম্পূর্ণ ভুল। তিনি বলেন, এটি খুবই বিপজ্জনক হতে পারে এবং চিকিৎসা নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকার সম্ভাবনাও নষ্ট করতে পারে। তিনি আরও বলেন, গুগলের এআই উত্তরে বলা হয়েছে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারে আক্রান্তরা উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলবেন এবং এর উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি এই পরামর্শ মেনে চলে, তাহলে পর্যাপ্ত ক্যালরি না পেয়ে ওজন বাড়াতে ব্যর্থ হতে পারে এবং কেমোথেরাপি বা জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রোপচার সহ্য করতে না পারার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। লিভারের রক্ত পরীক্ষার স্বাভাবিক মাত্রা কত—এমন অনুসন্ধানেও বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে অসংখ্য সংখ্যা দেখানো হলেও রোগীর বয়স, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় বা দেশের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ব্রিটিশ লিভার ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী পামেলা হিলি বলেন, এসব এআই সারাংশ উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, লিভার রোগে আক্রান্ত অনেকেরই শেষ পর্যায় পর্যন্ত কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তাই পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গুগল এআই ওভারভিউ যেটাকে ‘স্বাভাবিক’ বলছে, তা বাস্তবে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত মাত্রার থেকে অনেক ভিন্ন হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এটি বিপজ্জনক, কারণ এতে গুরুতর লিভার রোগে আক্রান্ত কেউ ভাবতে পারে তার রিপোর্ট স্বাভাবিক এবং পরবর্তী চিকিৎসা পরামর্শে আর যেতে আগ্রহী নাও হতে পারে। যোনি ক্যানসারের উপসর্গ ও পরীক্ষা বিষয়ক অনুসন্ধানে প্যাপ টেস্টকে যোনি ক্যানসারের পরীক্ষা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভুল। ইভ অ্যাপিল ক্যানসার দাতব্য সংস্থার প্রধান নির্বাহী অ্যাথেনা ল্যামনিসোস বলেন, এটি ক্যানসার শনাক্তের কোনো পরীক্ষা নয়, বিশেষ করে যোনি ক্যানসারের জন্য তো নয়ই—এটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। এ ধরনের ভুল তথ্যের কারণে কেউ সাম্প্রতিক সার্ভিক্যাল স্ক্রিনিং স্বাভাবিক এসেছে ভেবে যোনি ক্যানসারের উপসর্গ পরীক্ষা না করাতে পারে। তিনি আরও বলেন, একই অনুসন্ধান বারবার করলে এআই সারাংশ প্রতিবার ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিচ্ছে, যা ভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া। এর মানে মানুষ কখন অনুসন্ধান করছে তার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন উত্তর পাচ্ছে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ল্যামনিসোস বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমরা যে ফলাফলগুলো দেখেছি, সেগুলো সত্যিই ভয়াবহ এবং নারীদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। দ্য গার্ডিয়ান আরও দেখতে পায়, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অনুসন্ধানেও গুগলের এআই ওভারভিউ বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য দাতব্য সংস্থা মাইন্ড-এর তথ্য বিভাগের প্রধান স্টিফেন বাকলি বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, সাইকোসিস ও খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগের মতো অবস্থার বিষয়ে কিছু এআই সারাংশ অত্যন্ত বিপজ্জনক পরামর্শ দিচ্ছে এবং তা ভুল, ক্ষতিকর অথবা মানুষকে সাহায্য নিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান এমএসএম