অবসাদ বা ডিপ্রেশন-একটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি, অনিদ্রা, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা আর ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার যন্ত্রণা। আধুনিক জীবনের দৌড়ঝাঁপে এই সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ও থেরাপির পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা তাই খুঁজছেন এমন কিছু, যা দ্রুত কাজ করবে এবং দীর্ঘদিনের অবসাদে আটকে থাকা মানুষকে দ্রুত স্বস্তি দেবে। সেই খোঁজেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে পরিচিত লাফিং গ্যাস। লাফিং গ্যাস কী লাফিং গ্যাসের বৈজ্ঞানিক নাম নাইট্রাস অক্সাইড। সাধারণত দাঁতের চিকিৎসা বা ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের সময় ব্যথা ও উদ্বেগ কমাতে এই গ্যাস ব্যবহার করা হয়। অল্প সময়ের জন্য এটি শরীরে প্রশান্তি ও হালকা আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। এতদিন পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানে লাফিং গ্যাসকে মূলত অ্যানেসথেসিয়ার সহায়ক হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর প্রভাব হয়তো এখানেই শেষ নয়। ২৪ ঘণ্টায় বদলে যেতে পারে মননিয়ন্ত্রিত উপায়ে নাইট্রাস অক্সাইড ইনহেল করালে শুধু মুখে হাসিই ফোটে না, গবেষণায় দেখা গেছে-মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অবসাদের উপসর্গে চোখে পড়ার মতো উন্নতি হতে পারে। ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নাল ই-বায়োমেডিসিন-এ। প্রকাশের পর থেকেই মনোরোগ চিকিৎসার জগতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এই গবেষণায় মোট ১১টি ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে মেটা-অ্যানালিসিস। অর্থাৎ একাধিক স্বতন্ত্র গবেষণার তথ্য একত্র করে সামগ্রিকভাবে একটি চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্টের মতো সাত থেকে দশ দিন অপেক্ষা না করে, নাইট্রাস অক্সাইড নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বহু রোগীর মনমরা ভাব, মানসিক ক্লান্তি ও হতাশা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো,যে সব রোগী প্রচলিত ওষুধে সাড়া দেন না, অর্থাৎ ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশন, তাদের ক্ষেত্রেও লাফিং গ্যাস ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। গবেষকরা মোট ২৪৭ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা সাতটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ৫০ শতাংশ মাত্রার নাইট্রাস অক্সাইডের একটি মাত্র ডোজ ইনহেল করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিষণ্ণতার লক্ষণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে আসে। শুধু তা-ই নয়, এই ইতিবাচক প্রভাব প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত বজায় থাকে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। তবে গবেষকদের মতে, নির্দিষ্ট বিরতিতে একাধিক সেশন নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব। মস্তিষ্কে যেভাবে কাজ করেবিশেষজ্ঞদের মতে, নাইট্রাস অক্সাইড মস্তিষ্কের গ্লুটামেট রিসেপ্টরের উপর কাজ করে, যা মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঠিক একই পথেই কাজ করে কেটামিন,যা ইতিমধ্যেই ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে লাফিং গ্যাসের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গবেষণায় অংশ নেওয়া কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে মাথা ঘোরা, বমি ভাব বা মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা গেছে। তবে সেগুলো ছিল অল্প ও অস্থায়ী। যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিন ও অতিরিক্ত ব্যবহারে শরীরে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি বা চিন্তাশক্তির উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও চিকিৎসা প্রয়োগে সতর্কতা জরুরি। ভবিষ্যতের সম্ভাবনাইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে বৃহত্তর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশা, দ্রুত কার্যকর ও কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে অবসাদ চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। অবসাদের মতো জটিল মানসিক সমস্যায় যেখানে সময়ই সবচেয়ে বড় শত্রু, সেখানে লাফিং গ্যাস হয়তো সত্যিই এক নতুন আশার নাম হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: মিডিয়াম, সায়েন্স অ্যালার্ট, এনডিটিভি আরও পড়ুন: মৃত ব্যক্তিকে আইসিইউতে রাখা যায় না অঙ্কুরিত আলুতে স্বাস্থ্যঝুঁকি, জানুন গবেষণা কী বলছে এসএকেওয়াই/