ঘটনাস্থলে পড়ে আছে আগুনে পুড়ে যাওয়া জামার অবশিষ্টাংশ। বাড়ির উঠানভর্তি শত শত মানুষ। আহাজারিতে ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা। খোকন দাসের মৃত্যুর খবর পেয়ে দল বেঁধে ছুটে আসছেন আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষ। যিনি ১৭ বছর ধরে এলাকার মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে হয়েছিলেন আস্থার প্রতীক। অথচ সারাজীবন মানুষের পাশে থাকা ব্যক্তির জীবন গেলো এলাকার বখাটেদের হাতে। শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে ঘটে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল পৈচাশিকতার শেষ পর্যায়ে। প্রথমে টাকা লুট, ছুরিকাঘাত ও শেষে মৃত্যু নিশ্চিত করতে শরীরে পেট্রোল ঢেলে লাগিয়ে দেওয়া হয় আগুন। টানা তিনদিন মৃত্যু যন্ত্রণা শেষে অবশেষে জীবনের কাছে হার মেনে চলে গেলে পরপারে। তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও এলাকাবাসী। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় ছুরিকাঘাতের শিকার হন ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকার পল্লি চিকিৎসক খোকন দাস। এসময় তিনি হামলাকারীদের চিনে ফেললে তার শরীর ও মুখে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টায় চালানো হয়। তার চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। তিনদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার সকালে মারা যান খোকন দাস। আর মৃত্যুর আগে জানিয়ে যান অপরাধীদের নাম। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে খোকন দাসের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে তিন জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করলেও এখন পর্যন্ত অপরাধি রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। সরেজমিনে বিকেলে খোকন দাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠোন ভর্তি শত শত মানুষ। তার মৃত্যুর খবর শুনে দলবেঁধে লোকজন বাড়িতে আসা শুরু করে। মরদেহ বাড়িতে এখন পর্যন্ত না পৌঁছালেও উপস্থিত স্বজনরা বিলাপ করছেন। তার মায়ের সমাধির পাশে খোকন দাসকে সমাহিত করার আয়োজন চলছে। খোকন দাসের প্রতিবেশী সালাহউদ্দিন সরদার বলেন, খোকন কখনো হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ করতেন না। আমাদের অনুষ্ঠানে যেতেন তিনি। তাদের অনুষ্ঠানেও আমরা আসতাম। তিনি আমাদের সবসময় পাশে ছিলেন। তাকে আজ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, এটা আমরা মেনে নিতে পারছি না। অপরাধীরা যে দলের হোক না কেন তাদের আমরা কঠিন বিচার দাবি করি। আরও পড়ুনবিকাশের এজেন্টকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাই, চিনে ফেলায় শরীরে আগুনhttps://www.jagonews24.com/country/news/1080691 খোকন দাসের বোন কল্পনা রানী দাস বলেন, আমার ভাই অনেক ভালো। সবার চিকিৎসা করতো। কখনো কারো ক্ষতি করেনি। আজ কেন আমার ভাইকে মেরে ফেলা হলো। দরকার পড়লে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিতো। আমার ভাইয়ের পেটে বুকে মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। পরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা হত্যাকারীর ফাঁসি চাই। নিহত খোকন দাসের বাবা পরেশ দাস আক্ষেপ করে বলেন, হামলার তিনদিন হয়ে গেলো পুলিশ এখন পর্যন্ত অপরাধীদের ধরতে পারছে না। আমরা চাই অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক। আমি আমার সন্তানের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। এদিকে খোকন চন্দ্র দাসের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামের একটি সংগঠন শনিবার বিকেলে জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ কর্মসূচি পালন করেছে। মানববন্ধন শেষে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। হিন্দু মহাজোটের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব হেমন্ত কুমার দাস বলেন, ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত খোকন দাসের হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি। আমরা প্রশাসনকে বলতে চাই আপনারা অপরাধীদের ধরে প্রমাণ করে দিন বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। পুলিশ বলছে ঘটনার পরপর গা ঢাকা দিয়েছে অভিযুক্তরা। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার কথা জানালেন তারা। এ ব্যাপারে ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, খোকন দাস মৃত্যুর আগে যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের নাম বলে গিয়েছে। তাদের নামে ইতোমধ্যে থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপর আসামিরা গা ঢাকা দিয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যে কোনো উপায়ে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। বিধান মজুমদার অনি/আরএইচ