এলপি গ্যাসের বাজারে চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।লাইনের গ্যাস সরবরাহে সংকটের কারণে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মাহবুবা। নিয়মিত ব্যবহার করা একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে কয়েকটি দোকান ঘুরেও পাননি তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে মাহবুবা বলেন, লাইনের গ্যাসের জন্য মাসে বিল দিচ্ছি ১ হাজার ৮০ টাকা। সেখানে যদি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২ হাজার টাকা হয়, তাহলে সেটা মিডল ক্লাসের জন্য টু মাচ এক্সপেন্সিভ হয়ে যায়। এখন দাম বড় কথা না, গ্যাসটাই তো পাওয়া যাচ্ছে না। আরও পড়ুন: বিক্রেতাদের হাত ঘুরলেই বাড়ছে এলপি গ্যাসের দাম! এলপিজির দাম নিয়ে এমন নৈরাজ্য এখন রাজধানীজুড়েই। সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। সরকারি নির্ধারণ অনুযায়ী সাড়ে ১২শ টাকা দামের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অন্যান্য গ্রাহকরাও। তাদের অভিযোগ, দোকানভেদে এলপিজির দামে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কেউ ১ হাজার ৯০০ টাকা চাইছে, কেউ আবার ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছে। নাবিল নামে এক ক্রেতা বলেন, এলপিজির দাম সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে আমাদের জন্য। একটা গ্যাসে কিভাবে রাতারাতি ৭০০-৮০০ টাকা বেড়ে যায়? ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে বোতল কিনলে ঘরভাড়া দিব কীভাবে; আর খাবারই বা কীভাবে কিনব? গতকাল গ্যাস না পেয়ে রান্নাই করতে পারিনি। আরেক ক্রেতা মহসিন বলেন, ১০-১৫ দিন আগেও ১২ কেজির গ্যাস ১ হাজার ২৫০ টাকায় পাওয়া গেছে। হঠাৎ করে কী এমন হলো যে দাম এক লাফে ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকার ওপরে উঠে গেল? গতকাল রাতে গ্যাস কিনতে এসে ২ হাজার টাকা চেয়েছে, আজ আবার বলছে ২ হাজার ১০০ টাকার নিচে দেয়া যাবে না। খুচরা বিক্রেতারা দায় চাপাচ্ছেন ডিলারদের ওপর। তাদের দাবি, সরকার যে দামে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে, সেই দামে তারা নিজেরাই ডিলারদের কাছ থেকে গ্যাস পাচ্ছেন না। এক বিক্রেতা বলেন, সরকার দাম বেঁধে দিছে ঠিকই, কিন্তু ডিলার আমাদের কাছ থেকে আরও বেশি দাম নিচ্ছে। সব মিলিয়ে আমাদের বর্তমান কেনাই পড়ে যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা। এখন এই দামে কিনে তো আর কম দামে বিক্রি করা সম্ভব না। সর্বোচ্চ ১০০ টাকা লাভ করে বিক্রি করা হয়। তিনি আরও বলেন, দোকানে যে বোতলগুলো রয়েছে সেগুলো সব খালি। আমরাও নিজেরাই গ্যাসের সংকটে ভুগছি। আমাদের কাছে যদি গ্যাসই না থাকে, তাহলে গ্রাহককে কীভাবে দিব? তবে এলপিজির দাম নিয়ে বাজারে যে নৈরাজ্য চলছে, তার দায় নিতে নারাজ বেসরকারি অপারেটররা। বেসরকারি এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) শীর্ষ নেতার দাবি, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম ও পরিবহন খরচ বাড়লেও বিইআরসি নির্ধারিত দামেই পরিবেশকদের কাছে এলপি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। লোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমাদের কোনো মেম্বার নির্ধারিত দামের বেশি এক টাকাও বিক্রি করছে না। বরং আমরা অনেক সময় ফ্যাক্টরি থেকে আরও কম দামে গ্যাস সরবরাহ করি। এর পরে খুচরা পর্যায়ে কে কী দাম রাখছে, সেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। খুচরা বিক্রেতারা যে দাম বাড়াচ্ছে, সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া কেউ ঠিক করতে পারবে না। এলপিজির এমন অস্বাভাবিক দামে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি নেই বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। দ্রুত বাজার তদারকি না বাড়ালে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। আরও পড়ুন: এলপি গ্যাসের নতুন দাম জানা যাবে আজ তবে বাজার তদারকিতে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, বাজারে সরাসরি নজরদারি করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল তাদের নেই। তিনি বলেন, আমাদের নিজেদের খুব একটা লোকবল নেই কাজ করার জন্য। তাই এই বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে কাজে লাগানো হচ্ছে এবং হবে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলে মাঠ প্রশাসনকেও যুক্ত করা হবে। বাজারে এমন অস্থিরতার মধ্যেই রোববার (৪ জানুয়ারি) এলপি গ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিইআরসি। তবে বাস্তবতায় প্রায় সব সময়ই ঘোষিত দামের সঙ্গে বাজারের দামের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায় বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। বাজারের চলমান অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে নতুন দাম কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয়ে গ্রাহকরা।