সাড়ে ৪ ঘণ্টার অভিযানে যেভাবে মাদুরোকে তুলে আনলো যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযান চালিয়েছে, সেটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জটিল ও গোপন সামরিক অভিযান। মাসের পর মাস প্রস্তুতির পর ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানে অংশ নেয় মার্কিন স্পেশাল ফোর্স, সিআইএ ও এফবিআই। স্থানীয় সময় শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে বন্দি করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই অভিযানের পরিকল্পনা চলছিল বহু মাস ধরে এবং এর অংশ হিসেবে বারবার মহড়া দেওয়া হয়। সূত্র অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ডেল্টা ফোর্স মাদুরোর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের হুবহু একটি নকল কাঠামো তৈরি করে সেখানে অনুশীলন চালায়। কীভাবে সুরক্ষিত ও শক্তিশালী ওই ভবনে প্রবেশ করা হবে, তার প্রতিটি ধাপ ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তথ্য দেন মাদুরোর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি সিআইএর একটি ছোট দল গত আগস্ট থেকেই ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় ছিল। তারা মাদুরোর দৈনন্দিন চলাফেরা, সময়সূচি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানায়, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি সিআইএ’র জন্য কাজ করছিলেন এবং অভিযান চলাকালে তার অবস্থান নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর চারদিন আগে অভিযানের অনুমোদন দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’। ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্টে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বসে সরাসরি লাইভ স্ট্রিমে পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন ট্রাম্প। বিশাল সামরিক মোতায়েন পেন্টাগন এর আগেই ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করে। একটি বিমানবাহী রণতরী, ১১টি যুদ্ধজাহাজ, এক ডজনের বেশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ মোট ১৫ হাজারের বেশি সেনা ওই অঞ্চলে অবস্থান নেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলোকে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ বলা হলেও বাস্তবে এগুলোই ছিল মূল সামরিক প্রস্তুতি। সূত্র জানায়, স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ—এই চারজনকে কেন্দ্র করে একটি মূল টিম মাসের পর মাস নিয়মিত বৈঠক ও ফোনালাপ চালান এবং প্রায়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন। শুক্রবার গভীর রাতে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। জেনারেল কেইন জানান, এই অভিযানে ২০টি ঘাঁটি থেকে ১৫০টির বেশি আকাশযান অংশ নেয়, যার মধ্যে এফ-৩৫, এফ-২২ এবং বি-১ বোমারু বিমান ছিল। রয়টার্সের তোলা ছবিতে কারাকাসের লা কারলোটা বিমানঘাঁটিতে ভেনেজুয়েলার বিমানবিধ্বংসী ইউনিটের পোড়া সামরিক যান দেখা গেছে। কারাকাসে স্পেশাল ফোর্সের অভিযান হামলার আড়ালে ভারী অস্ত্রসহ মার্কিন স্পেশাল ফোর্স কারাকাসে প্রবেশ করে। মাদুরোর আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশের প্রয়োজনে স্টিলের দরজা কাটার জন্য ব্লোটর্চ পর্যন্ত সঙ্গে নেওয়া হয়। শুক্রবার রাত ১টার দিকে মার্কিন সেনারা মাদুরোর আবাসিক কমপাউন্ডে পৌঁছালে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটি উড়তে সক্ষম ছিল। শহরের বাসিন্দাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া একাধিক হেলিকপ্টার দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত সেনা ও এফবিআই সদস্যরা ‘অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ভবনটিতে ঢুকে পড়েন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যে দরজাগুলো ভাঙার জন্যই বানানো হয়নি, সেগুলোও তারা কয়েক সেকেন্ডে ভেঙে ফেলেন।’ মাদুরো বন্দি মার্কিন সেনারা ভবনের ভেতরে ঢোকার পর মাদুরো ও তার স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেন। ট্রাম্প জানান, মাদুরো একটি সেফ রুমে ঢোকার চেষ্টা করলেও দরজা বন্ধ করতে পারেননি। অভিযানে কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হলেও কেউ নিহত হননি। অভিযান শুরু হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের বিষয়টি জানান। তবে অভিযান শুরুর আগে কিছু জানানো হয়নি। ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ত্যাগ করার সময় মার্কিন বাহিনী একাধিক আত্মরক্ষামূলক সংঘর্ষে জড়ায়। ভোর ৩টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারগুলো সমুদ্রের ওপর পৌঁছায়। মাদুরো ও তার স্ত্রী তখন সেগুলোর ভেতরেই ছিলেন। প্রায় সাত ঘণ্টা পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে আরেকটি পোস্ট দেন। সেখানে চোখ বাঁধা, হাতকড়া পরা অবস্থায় ধূসর ট্রাউজার পরিহিত মাদুরোর একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘ইউএসএস আইও জিমা জাহাজে নিকোলাস মাদুরো।’ সূত্র: রয়টার্সকেএএ/