গুম থেকে জামায়াত-শিবিরের ফিরেছেন ৭৫ শতাংশ নেতাকর্মী, বিএনপির ২২

এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই করে এক হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে গুম কমিশন।রোববার (৪ জানুয়ারি) গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে এমন মন্তব্য করেছে। বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া। কমিশন জানায়, মোট এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই বাছাই শেষে এক হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। প্রতিবেদন থেকে কমিশন জানায়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। যারা এখনো নিখোঁজ তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। এখনো অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন জানিয়ে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভিক্টিমের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না, কিংবা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছে যাদের সঙ্গে আমরা নিজ থেকে যোগাযোগ করলেও তারা অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’ বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে জানিয়েছেন কমিশন সদস্যরা। তারা বলেন, আমরা যে ডেটা পেয়েছি তা দিয়ে প্রমাণিত যে, এটি পলিটিক্যালি মোটিভিটেড ক্রাইম। আরও পড়ুন: বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল জানা গেল কমিশন জানায়, হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। কমিশন সদস্যরা আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে হস্তান্তরের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে এটি স্পষ্ট হয় যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে। গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ছবি প্রেস উইং অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনা বর্ণনা করলেন, পৈশাচিক বলে যে শব্দ আছে বাংলায়, এক কথায় বললে এই ঘটনাগুলোকে সেই শব্দ দিয়েই বর্ণনা করা যায়। এই নৃশংস ঘটনার মধ্য গিয়ে যারা গিয়েছেন, আপনারাও তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্য দিয়ে, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই নৃশংস ঘটনাগুলো দেখেছেন। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা যেত না।’ আরও পড়ুন: মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৫ চূড়ান্ত অনুমোদন প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, সেটার ডকুমেন্টেশন এই রিপোর্ট। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বিভৎস হতে পারে- এইটা তার ডকুমেন্টেশন। যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আমাদের মতোই মানুষ। নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে। এই নৃশংসতা যেন আর ফিরতে না পারে সেই প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করতে হবে।’ রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এছাড়া কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যতের করণীয় পেশ করার বিষয়েও নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। এছাড়া, আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব জায়গায় বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে সে জায়গাগুলো ম্যাপিং করতে নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা। কমিশন জানায়, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশের গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে। প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যরা। প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন হতো না উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘আপনি দৃঢ় ছিলেন বলেই আমরা পেরেছি। আপনি সবসময় আমাদের যা কিছু প্রয়োজন ছিল সেই সহায়তা দিয়েছেন। আপনিই আমাদের মনোবল দৃঢ় করেছেন।’