ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালানো মার্কিন ডেল্টা ফোর্স কেন এত দুর্ধর্ষ

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের সুরক্ষিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যখন মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা, ঠিক তখনই আকাশ চিরে নামলো যমদূত। কোনো সাধারণ সেনা নয়, তারা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে রহস্যময় ও দুর্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’। মাত্র ২০ মিনিটের ঝোড়ো অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে শোবার ঘর থেকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে। এই নজিরবিহীন ঘটনার পর আবারও আলোচনায় বিশ্বসেরা এই বিশেষ বাহিনী। ডেল্টা ফোর্স আসলে কী? পেন্টাগনের নথিতে এদের নাম ‘ফার্স্ট স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট-ডেল্টা’ (ফার্স্ট এসএফওডি-ডি)। তবে বিশ্বজুড়ে এরা ডেল্টা ফোর্স বা ‘দ্য ইউনিট’ নামেই পরিচিত। ১৯৭৭ সালে কর্নেল চার্লস বেকউইথ এই বাহিনী গঠন করেন। এদের প্রধান কাজ হলো সন্ত্রাসবাদ দমন, জিম্মি উদ্ধার ও উচ্চপদস্থ শত্রুকে বন্দি করা। পেন্টাগন কখনোই ডেল্টা ফোর্সের সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করে না। এমনকি, অভিযানে যাওয়ার সময়ও তারা কোনো ইউনিফর্ম বা পরিচয়পত্র বহন করে না। বেসামরিক পোশাকে এরা শত্রু দেশের ভেতর সাধারণ মানুষের মতো মিশে থাকতে পারে। মাদুরোকে আটকের এই মিশন প্রমাণ করে দিলো যে ডেল্টা ফোর্সের জন্য পৃথিবীর কোনো দেয়ালই অভেদ্য নয়। যেসব কারণে তারা দুর্ধর্ষ ও‘অজেয়’ ১. মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রশিক্ষণ এই ইউনিটে যোগ দিতে চাওয়া সেনাদের এমন শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাদের গভীর জঙ্গল বা জনমানবহীন পাহাড়ে একা ছেড়ে দেওয়া হয় শুধু একটি ম্যাপ ও কম্পাস দিয়ে। প্রার্থীদের ১৮ থেকে ৪০ মাইল পর্যন্ত ভারী ওজনের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দুর্গম পাহাড় পাড়ি দিতে হয়। এই প্রশিক্ষণে প্রায় ৯৫ শতাংশ সৈন্যই বাদ পড়ে যান। যারা টিকে থাকেন, তারা হয়ে ওঠেন একেকজন ‘জীবন্ত যন্ত্র’। ২. বিশেষায়িত যুদ্ধকৌশল ডেল্টা ফোর্স মূলত সন্ত্রাসবাদ দমন, জিম্মি উদ্ধার এবং উচ্চ পর্যায়ের শত্রুকে আটক বা নির্মূল করার জন্য বিশেষায়িত। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘সারপ্রাইজ অ্যাটাক’ বা আকস্মিক হামলা। খুব কম সময়ের নোটিশে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিখুঁত অপারেশন চালাতে তারা পারদর্শী। ৩. প্রযুক্তির জাদুকর এরা এমন সব অস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে, যা সাধারণ সৈন্যদের কাছে স্বপ্ন। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে দিবালোকের মতো দেখার ক্ষমতা, নিঃশব্দে দেয়াল ফুঁড়ে শত্রু দেখার রেডার ও অদৃশ্য হওয়ার মতো ছদ্মবেশ তাদের প্রধান অস্ত্র। কারাকাসের অভিযানে তারা পুরো শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও সামরিক রাডার এক নিমিষেই ‘জ্যাম’ করে দিয়েছিল। ৪. মানসিক শীতলতা ডেল্টা ফোর্সের সদস্যদের বলা হয় ‘দ্য কোয়ায়েট প্রোফেশনালস’ বা ‘নীরব পেশাদার’। চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও তারা ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত অভিযান ও গুলি চালাতে পারদর্শী। কারাকাসে মাদুরোর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের বাধা দেওয়ার ন্যূনতম সুযোগ দেয়নি তারা। ইতিহাসের পাতায় ডেল্টা ফোর্সের সাফল্য কারাকাস অভিযানই প্রথম নয়, এর আগেও ডেল্টা ফোর্স একাধিকবার বিশ্বকে অবাক করেছে। ২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে একটি গর্ত থেকে টেনে বের করে এনেছিল এই ডেল্টা ফোর্স। ২০১৯ সালে সিরিয়ায় আইএস প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদিকে ধরার অভিযানেও নেতৃত্ব দেয় তারা। নরিয়েগা ও এল চ্যাপো: পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা ও মেক্সিকান মাদক সম্রাট এল চ্যাপোকে ধরার পেছনেও ছিল এই বাহিনীর ছায়া। সূত্র: দ্য ওয়ার জোন, হোয়াইট হাউজ, পেন্টাগন এসএএইচ