থানায় চুরি হওয়ার ভয়ে নদীতে ৩১টি গরু রেখেছেন ওসি, ঠান্ডায় মৃত্যু!

নদীপথে অভিযান চালিয়ে চোরাই গরু সন্দেহে একটি নৌকাসহ ৩১ টি গরু আটক করেছিল সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ। এরপর থানা থেকে গরু চুরির ভয়ে নিজেই ভীত হয়ে পড়েন ওসি রতন শেখ। চোরদের কাছ থেকে নিজের থানা ও পুলিশ ফাঁড়িকেও অনিরাপদ মনে করেন তিনি।তার ধারণা, পুলিশ ফাঁড়ি বা থানার মাঠে গরু রাখা হলে বড় গরুগুলো চুরি হয়ে যাবে। তাই মামলার কার্যক্রম শেষ হয়ে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত গরুগুলোকে নদীতেই ভাসমান রাখার নির্দেশনা দেন তিনি। এতে তীব্র শীতে ও অর্ধাহার অনাহারে ১৯ দিনে একের পর এক গরু নির্মমভাবে মারা যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, তীব্র শীতে পানির ওপর ভাসমান থাকায় অসুস্থ হয়ে ৬ টি গরুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে এলাকাবাসীর ধারণা কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ টি গরুর মৃত্যু হতে পারে। তারা জানান, গরুগুলো ঠিক কতোটা বেঁচে আছে তা দেখতে যেতেও মানা ওসি রতন শেখের। তবে রাতের অন্ধকারে মৃত গরুগুলো নদীর পানিতে ফেলে দেয়ার অভিযোগও করা হয় ওসির বিরুদ্ধে।বিতর্কের মুখে ওসি রতন শেখ:সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন থানায় তিনি ফেসবুকে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে আলোচনা সমালোচনায় থাকলেও তার সবশেষ বদলিকৃত কর্মস্থল সুনামগঞ্জ সদর থানায় যোগ দিয়েই একাধিক সমালোচিত কর্মকাণ্ডে পড়েছেন মানুষের বিতর্কের মুখে। রয়েছে ধোপাজান নদী থেকে রাতের আধারে চুরিকৃত বালুবাহী নৌকা বের করতে একটি চক্রের সক্রিয়তাকে আড়ালে থেকে উৎসাহ দেয়ার অভিযোগও।এই নদীতে বালু লুটপাটকে কথিত প্রশ্রয় দেয়াকে কেন্দ্র করে একজন পুলিশ সুপার ও তিন ওসিসহ ১২ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। বর্তমানে সদর পুলিশের চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ এই নদীপথ ধরে রাতের অন্ধকারে একের পর এক বালু লুটকারী নৌকা বের হওয়াতে এলাকাবাসীর প্রশ্নের মুখে পড়েছে ওসি রতনের ভূমিকা।আরও পড়ুন: সিলেটের ৬টি আসনে ৩৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ, বাতিল ৭স্থানীয়দের মতে, নৌকা বের হওয়ার সময় ওসি রতনকে মুঠোফোনে জানালে তিনি তথ্য প্রদানকারীকে উল্টো তীরষ্কার করছেন। তার এমন কর্মকাণ্ডে সদর থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সমালোচনা।এতে নদীর দুই তীরের গ্রামবাসী নিজেরাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ধোপাজান নদীতে রাতের অন্ধকারে চলা বালু লুটকারী নৌকা ধরে পুলিশে দিচ্ছেন। গত ৩ জানুয়ারি রাতেও ৫ টি বালু বোঝাই নৌকা আটক করে পুলিশে দেন গ্রামবাসী। সম্প্রতি এমন ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে সুনামগঞ্জে।সময় সংবাদের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ:গেল ১৭ ডিসেম্বর সুরমা নদী হয়ে ভারতীয় গরুর একটি চালান আটক করে বিচারিক কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত ৩১ টি গরুকে নদীতেই ভাসমান অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত দেন ওসি। অথচ বিচারিক কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত গরুগুলোর দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণসহ পরিচর্যার যাবতীয় দায়িত্বের ব্যাপারে যথাযথ নির্দেশনা ছিল আদালতের। এমনকি এই কাজে যাবতীয় খরচও দেয়া হবে বলে জানানো হয় আদালতের পক্ষ থেকে। সময় সংবাদকে ব্যাপারটি নিশ্চিতও করেছেন ওসি রতন।তবে পুলিশ হেফাজতে থাকা গরু নদী থেকে উপরে তুলে থানা বা ফাঁড়িতে রাখলে নিরাপদে থাকার পরিবর্তে ‘বড় গরুগুলো চুরি হয়ে অন্য গরু রেখে দেয়া হতে পারে’ বলে তার এমন মন্তব্য অবাক করেছে স্থানীয় মানুষ। অনেকটা প্রকাশ্যেই তিনি তার এই অভিমত প্রচার করছেন। অন্যদিকে তীব্র শীতের মধ্যে ঘন কুয়াশায় নদীতে থাকা গরুগুলোর সঠিক পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি না দেয়ায় গেল ১৯ দিনে একের পর এক গরুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত গরুকে রাতের অন্ধকারে লোকচক্ষুর আড়াল করতে গিয়ে নদীতে ফেলে দেয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। যদিও নিজের এমন অমানবিক কর্মকাণ্ড ও পশু মৃত্যুর দায় ওসি রতন আদালতের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।তার দাবি, ‘আদালত রায় যতদিন পর্যন্ত দিচ্ছেন না, ততদিন এভাবে গরুগুলো মরতে থাকলেও কিছুই করার নেই।’সময় সংবাদকে ওসি রতন বলেন, ‘আমি নিজের টাকা দিয়ে গরুর খাবার দিচ্ছি, একজন লোক নিয়োগ করে দিছি, টাকা পয়সা আমার যাচ্ছে, আদালত বলেছেন পরে আমার এসব খরচ আমাকে দেয়া হবে।’সময় সংবাদের অনুসন্ধান:গরুগুলোর খাবার ও দেখভালে স্থানীয় এক যুবককে নিয়োগ দেয়ার কথা জানান ওসি রতন শেখ।  তবে সম্প্রতি তাকে ওই স্থানে গিয়ে খোঁজ করে পাওয়া যায়নি। পরে ওসি রতন শেখ তাকে না পেয়ে প্রতিবেদকের উপস্থিতিতেই খবর পাঠালে প্রায় ৩০ মিনিট পর হাজির হন এক যুবক। সময় সংবাদের প্রতিবেদকের সামনে ওসি রতন তাকে নিজের পকেট থেকে টাকা দেন বলে জানালেও  ওসি রতন স্থান ত্যাগ করলে সময় সংবাদকে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন স্থানীয়রা।তারা জানান, ওসির কাছে এই যুবকের পাওনা টাকার পরিমাণ ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। পারিবারিক অসচ্ছলতা নিয়েও এই যুবক নিজের পকেট থেকে উল্টো টাকা দিয়ে গরুর জন্য খাবার কেনাসহ অন্যান্য কাজ করছেন। ব্যাপারটি স্বীকার করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক। তিনি বলেন, ‘আমি যে এসব কথা বলেছি তা সত্য হলেও ওসি সাহেব জানলে আমার সাথে খুব খারাপ কিছু হবে।’খাবারের পরিমাণ:জব্দ তালিকার ৩১ টি গরুর শুরু থেকে খাবারের আয়োজন শুনে অবাকই হওয়ার কথা। এমন আয়োজন শুনে বোঝার বাকি থাকে না নির্মম মৃত্যুর পেছনের কারণ সম্পর্কে। একে তো তীব্র ঠান্ডা, অন্যদিকে খাবার সংকট।দেখভালের দায়িত্বে থাকা যুবক সময় সংবাদকে জানান, গরুগুলোকে দিনে দুই বেলা খাবার দেয়া হয়। এজন্যে ১০ কেজি ভুসি আনা হয়েছিল গতকাল। আগের দিনে দুই বেলা খাবার দেয়ার পরও এই ভুসি রয়ে গেছে। আজও ওখান থেকে খাওয়ানো হয়েছে দুই বেলা। কাল শেষ হবে। কয়েক আটি শুকনো খড়ও রয়েছে।’আরও পড়ুন: সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থীর মনোনয়ন স্থগিতস্থানীয় এক ব্যক্তি পরিচয় গোপন রেখে বলেন, ‘২৫-৩০ টি গরুর ১ বেলা খাবারও হয় না ১০ কেজি ভুসিতে, সেখানে এই ভুসি দিয়ে তারা তিনদিনও চালায়, অবহেলা আর খাবারের অপর্যাপ্ততার জন্যেও চোখের সামনে  মরছে গরুগুলো। পুলিশের এমন অমানবিকতা কেউই মেনে নিতে পারছেন না, আবার ওসির বিরুদ্ধে মুখ ফুটে কিছু বলারও সাহস করতে পারছেন না, পরে আবার কোনো বিপদ হয়।’এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ সদর থানার অফিসার্স ইনচার্জ রতন শেখ বলেন, ‘আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত গরুগুলো নদীতেই থাকবে, থানা বা ফাঁড়িতে রাখলে বড় গরুগুলো চুরি হয়ে যেতে পারে, পরে দেখা যাবে গরু ছোট হয়ে গেছে, বদলে গেছে, এখন গরু মারা গেলে কিছুই করার নেই। আদালতের কার্যক্রম যতদিন চলবে গরুও ততদিন এখানে থাকবে। আর নদী পথে বালুর নৌকা বের হলে যারা অভিযোগ করে তারা পাহারা দেয় নাকি?’অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) রাকিবুল হাসান রাসেল সময় সংবাদকে বলেন, ‘ওসি রতন সাহেবের ওখানে সম্ভব তো গরুগুলো রাখার মতো কোনো জায়গা নেই। তবে তিনি নিজেই যদি বলেন গরু চুরি হয়ে যাবে, সেটা তিনি বলতে পারেন না। হয়তো অন্য কিছু চিন্তা করা যেতে পারে, আমরা চেষ্টা করছি গরুগুলোর মৃত্যু ঠেকাতে একটা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের। আর নদীপথে নৌকা বের হলে অভিযোগ পাওয়া মাত্র পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। ওসি এভাবে তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের যে ব্যাপারটি জানলাম তা দুঃখজনক, আমরা ব্যাপারটি দেখব।’