গ্রাহক সংখ্যা ও পানির দর বৃদ্ধির পরও লোকসান পিছু ছাড়ছে রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছরই লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বড় ধরনের হিসাবের গরমিল পাওয়া গেছে, যা আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পানি বিক্রি, নতুন সংযোগ ও নিবন্ধন ফি এবং টেন্ডার বিক্রি থেকে রাজশাহী ওয়াসার রাজস্ব আয় ছিল ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। নাগরিক সমাজ ও ভোক্তাদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও পানির দর তিনগুণ বাড়ার পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদনে আয় কমে ১৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। যদিও এসময়ে শহরজুড়ে পানির সংযোগ বেড়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াসা নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ২০২২-২৩ সালে ৪৮ হাজার ৬৪৫ থেকে ২০২৩-২৪ সালে বাড়ে ৪৯ হাজার ৯৫৮ জনে। ২০২৪-২৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১ হাজার ৬৪২ জনে। আরও পড়ুন: ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার নিষিদ্ধ, বিপাকে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা বাংলাদেশ বেতার: অফিসে আসেন না বার্তা সম্পাদক, সংবাদ সম্পাদনা করেন সহায়ক অন্যদিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের রাজস্ব আয়ের সঙ্গে বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানো রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে, যা হিসাবরক্ষণ, আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী পানি বিক্রি, নতুন সংযোগ ও নিবন্ধন ফি এবং টেন্ডার বিক্রি থেকে ওয়াসার রাজস্ব আদায় ছিল ১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা ওই বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের চেয়ে তিনগুণ বেশি। ওই বছর ওয়াসার মোট আয় দাঁড়ায় ২০ কোটি ৩১ লাখ টাকায়, যার বিপরীতে ব্যয় ছিল ৩০ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ২০২৩-২৪ সালে আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় ছিল ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, আর মোট আয় ২৩ কোটি ২৩ লাখ এবং ব্যয় ৩১ কোটি ৯৪ লাখ। ২০২৪-২৫ সালে রাজস্ব বেড়ে ২০ কোটি ১৮ লাখ এবং মোট আয় ২৫ কোটি ৬২ লাখ হলেও ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রাহক সংখ্যা বাড়ার পরও আয় ও ব্যয়ের মধ্যে এই ব্যবধান বাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং দুর্বল আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, যখন গ্রাহক ও আয় দুটোই বাড়ছে, তখন টানা লোকসান সাধারণত নিয়ন্ত্রণহীন পরিচালন খরচ, ত্রুটিপূর্ণ কেনাকাটা বা প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁকফোকর নির্দেশ করে। বার্ষিক প্রতিবেদন ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের এই পার্থক্য ওয়াসার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি সরকারি ব্যাংকের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘হয় অভ্যন্তরীণভাবে আয় কম দেখানো হচ্ছে অথবা অডিট নথিতে বেশি দেখানো হচ্ছে। দুটি পরিস্থিতিই জবাবদিহিতা ক্ষুণ্ণ করে ও এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আরও পড়ুন: তানোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য ‘মৃত্যুকূপ’ চেয়ারম্যানকেও গুনছেন না রাকাব এমডি বার্ষিক প্রতিবেদনে আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে রাজশাহী ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, তারা বছরে চারবার তিন মাস অন্তর পানির বিল ইস্যু করেন। তবে সর্বশেষ কিস্তির বিল দেরিতে পাওয়ায় তা গত অর্থবছরের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এটি পরবর্তী অর্থবছরের রাজস্বের সঙ্গে যোগ করা হবে। বার্ষিক ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বড় গড়মিলের বিষয়ে প্রধান বাজেট কর্মকর্তা আব্দুর রহমান দাবি করেন, আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখানো রাজস্ব তাদের লক্ষ্যমাত্রা, বার্ষিক প্রতিবেদনে যা দেখানো হয়েছে তা প্রকৃত আদায়। তবে আর্থিক বিশ্লেষকরা প্রধান বাজেট কর্মকর্তার এই যুক্তিকে ‘ধোঁকাবাজি বা বিভ্রান্তিকর’ বলে মনে করছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অডিট ও বার্ষিক প্রতিবেদন দুটিই অর্থবছর শেষ হওয়ার পর প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। ক্রমবর্ধমান লোকসান প্রসঙ্গে রাজশাহী ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) তৌহিদুর রহমান জানান, সর্বশেষ ২০২৩ সালে তারা পানির দর বাড়িয়েছিলেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বছর পানির দর ৫ শতাংশ সমন্বয় করা প্রয়োজন। কিন্তু তারা তা করতে পারেননি। তিনি আরও জানান, বর্তমানে সংস্থাটির বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই বড় প্রকল্পগুলো শেষ হলে লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্য আরও কর্মসূচি নিতে পারবেন তারা। এছাড়াও বকেয়া বিল আদায়ে তারা কাজ করছেন। আশা করছেন আগামী দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে গ্রাহকরা ওয়াসার বার্ষিক ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বড় গড়মিলের স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, টানা লোকসানের বোঝা একপর্যায়ে দর বাড়িয়ে বা সেবার মান খারাপ করে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘গ্রাহক বাড়ছে, মানুষ বিল দিচ্ছে, তবুও প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে লোকসান করছে। স্বচ্ছতা না থাকলে এর ভার জনগণের ওপর বর্তাবে।’ এমএন