লাভের আশায় পেঁয়াজের চারা রোপণ করলেও সার পাচ্ছেন না চাষিরা

গত বছর পেঁয়াজের ভালো দাম ছিল বাজারে। মৌসুমের শুরুতে ৩৫-৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। এরপর দাম বেড়ে হয়েছে ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা। এখনও বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে। যেখানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকা।ফলে খরচ বাদ দিয়ে বেশ লাভ রয়েছে চাষিদের। তাই চলতি বছর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পেঁয়াজের আবাদে বেশ আগ্রহ চাষিদের। মাঠে মাঠে পেঁয়াজের চারা রোপণে রীতিমতো ধুম পড়েছে। কিন্তু ঠিক মতো সার পাচ্ছেন না এখানকার কৃষকরা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে চাহিদামত টিএসপি, এমওপি ও ডিওপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কেজিতে ৫-১০ টাকা বেশি দিলেই সার দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের  কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য মতে, কুমারখালী উপজেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ হাজার ৯২০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বছরজুড়ে ভালো দাম পাওয়ায় পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত জমিতে পেঁয়াজ চাষাবাদের প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ। জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষ ও পরিচর্চা বাবদ এ বছর প্রতি হেক্টরে খরচ পড়ছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। আরও পড়ুন: রাতের আঁধারে পেঁয়াজের চারা কেটে দিল দুর্বৃত্তরা, কৃষকের আহাজারি উপজেলার পান্টি, বাগুলাট, নন্দলালপুর ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা দলবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন। এ সময় এই প্রতিবেদক বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেন। পান্টি ইউনিয়নের ভালুকা গ্রামের ইশাক আলীর ছেলে লাল্টু আলী শেখ বলেন, গত বছর পেঁয়াজের ভালো দাম ছিল। প্রতি কেজি ৪০ থেকে ১৩৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। সেজন্য মানুষ অন্যান্য চাষ বাদ দিয়ে পেঁয়াজ চাষ করছেন।  চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না  কিন্তু পেঁয়াজ চাষের জন্য চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন লাল্টু শেখ। এই যুবক জানান, তিনি এবার তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চারা রোপণ করেছেন। তবে পরিমিত সার দিতে পারেননি তিনি। ভালুকা পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত আবু দাউদ শেখের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমি দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছি। ডিলার লাইন ধরিয়ে ন্যায্যমূল্যে ১০-২০ কেজির বেশি সার দিচ্ছে না। কিন্তু সাব ডিলাররা বস্তা ধরে সার দিচ্ছে। তবে বস্তাপ্রতি ৫০০-৭০০ টাকা বেশি নিচ্ছে। আরও পড়ুন: শীতের সবজির দাম কমেছে, স্বস্তি ফিরছে পেঁয়াজেও তবে ভবিষ্যতে সার দেবে না- এই আশঙ্কায় ওই সাব ডিলারের নাম বলেননি তৌহিদুল। তার ভাষ্য, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সাব ডিলারদের মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে। যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের জহির হোসেনের ছেলে আবু বাদশা চলতি মৌসুমে প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, জমির ইজারা, চাষ, চারা রোপন ও পরিচর্যা বাবদ প্রতি বিঘা জমিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর ৬০ থেকে ৭০ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তাতে পেঁয়াজ চাষ করে চাষিরা খুবই লাভবান হচ্ছে। আবু বাদশারও অভিযোগ, সার পাওয়া যাচ্ছে না। বিঘাপ্রতি ১০ কেজির বেশি সার দেয় না ডিলার। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে  হচ্ছে। তিনি ডিলারের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে চাহিদা মতো সার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। লক্ষীপুর গ্রামের মৃত জনাব আলীর ছেলে আক্কাস আলী বলেন, প্রায় তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজ করেছি। কয়ক বছর ধরে সারের খুব সংকট। বেশি টাকায় সার কিনে চাষ করতে গিয়ে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। কৃষকরা চরম সংকটে আছে। সরকার যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে হেলপার নিহত বিশ্বস্ত সুত্রে সারের দাম বেশি নেয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। সূত্র জানিয়েছে, এক হাজার ৩৫০ টাকা বস্তা টিএসপি সার এক হাজার ৮৫০ থেকে দুই হাজার টাকা, এক হাজার ৫০ টাকা বস্তা ডিএপি সার এক হাজার ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং এক হাজার টাকা বস্তা এমওপি সার এক হাজার ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে। কৃষকদের এই অভিযোগের কথা স্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি খন্দকার আব্দুল গাফফার। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার দিচ্ছে না সরকার। মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও সারের যোগান হয়নি। ফলে কৃষকদের চাহিদা মতো সার দিতে পারছে না ডিলাররা। তবে কোনো ডিলার অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে না বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, সাব ডিলার ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থান থেকে সার সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। এদের আইনের আওতায় আনা দরকার। সার নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম। তিনি বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ন্যায্যমূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দাবির সঙ্গে বাস্তবতার তেমন মিল নেই। বেশি দামে সার বিক্রি করার সময় অভিযান চালিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। করা হয়েছে জরিমানাও। আরও পড়ুন: শ্বশুরবাড়ির উঠনে পড়ে ছিল যুবকের মরদেহ, বাঁ চোখে রক্তের চিহ্ন এদিকে সার নিয়ে ডিলাররা কোনো সিন্ডিকেট করলে তা ক্ষতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, কৃষকরা যেন সরকারি দামে এবং চাহিদা অনুযায়ী সার পাই, সেই লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে প্রশাসন।