রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারায় বাড়ছে উদ্বেগ

২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি আয় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্ক ও দেশের চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় রপ্তানিকারকরা রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। সেই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস ডিসেম্বরেও রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ইপিবির সবশেষ তথ্য অনুসারে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রপ্তানি আয়ের চিত্র জাতীয় রপ্তানি ও অর্থনীতির প্রাণভোমরা তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের রপ্তানি আয় এ সময়ে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। খাতটির মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি ১০ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ৩ দশমিক ২২ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি ৯ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ কমেছে। আরও পড়ুননতুন বছরে দেশের অর্থনীতি: সংকটের মধ্যেও পুনরুদ্ধারের আশা২০২৬ সালে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াবে১২৫৩ টাকার এলপিজি ২০০০ টাকা, দায় কার? হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরে ২৫৪ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে ২৫৪ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এর মধ্যে চিংড়ি রপ্তানি ১৭২ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৭৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা দিয়েছে। ফলে পোশাকপণ্যের চাহিদা কমে গেছে। কাজের অর্ডারের প্রবাহও মন্থর। বিশেষ করে মার্কিন বাজারে আমরা অর্ডারের ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের পতন দেখেছি।-বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কৃষিপণ্য রপ্তানি আগের অর্থবছরের ৫৯৫ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৩৪ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ হ্রাসের প্রতিফলন। ওষুধ রপ্তানি ১১৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১১৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়ে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে প্লাস্টিকপণ্যের রপ্তানি ১৫৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৪৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরে ৫৭৭ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ৬১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এর মধ্যে কাঁচা চামড়া রপ্তানি ৬২ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৬১ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলারে নেমে ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ১৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৯৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে চামড়ার জুতা রপ্তানি ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার থেকে সামান্য বেড়ে ৩৫৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়ে ০ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের ৪১৭ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪১৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ০ দশমিক ৩১ শতাংশ সামান্য প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। তবে বিশেষায়িত টেক্সটাইল রপ্তানি ১৯৫ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৮৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছে। এছাড়া হোম টেক্সটাইল রপ্তানি ৪১১ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪২৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও নন-লেদার জুতা রপ্তানি ২৭৩ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৬৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি গন্তব্যের দিক থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের শীর্ষ তিন বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, জার্মানিতে ১৮ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি উদীয়মান ও কৌশলগত বাজারেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি ২৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং কানাডায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবস্থানকে তুলে ধরে। যে কারণে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি বিশেষজ্ঞ ও শিল্প ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা বলছেন, রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মূল কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক ও সরকারের নীতি সহায়তা প্রত্যাহার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানায়, বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, বাংলাদেশ যেসব বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সেখানে চীনের মনোযোগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা—এসব বহিরাগত চাপ সামগ্রিকভাবে দেশের রপ্তানি খাতে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। একই সময়ে মার্কিন বাজারেও রপ্তানি ভালো অবস্থায় নেই। আমাদের প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন করা।-সিপিডি ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা দিয়েছে। ফলে পোশাকপণ্যের চাহিদা কমে গেছে। কাজের অর্ডারের প্রবাহও মন্থর। বিশেষ করে মার্কিন বাজারে আমরা অর্ডারের ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের পতন দেখেছি।’ তিনি বলেন, ‘চীন ও ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে হুড়োহুড়ি করে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাংলাদেশের বাজারের অংশ দখল করছে, যা দেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’ ‘চীন ও ভারত তাদের রপ্তানিকারকদের শুল্কের ধাক্কা মোকাবিলায় প্রণোদনা দিচ্ছে, ফলে তাদের পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ এলডিসি স্নাতক ও আইএমএফের সুপারিশ মেনে সুবিধা ও প্রণোদনা কমিয়েছে।’ উল্লেখ করেন তিনি। হাতেম দাবি করে বলেন, ‘আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের কাছ থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি এবং শ্রম আইন ও ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি আমাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে আমরা পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো আশার রেখা দেখতে পাচ্ছি না। এই অর্থবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি নবনির্বাচিত সরকার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অর্থবছরের শেষ নাগাদ আমরা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখতে পারি।’ ‘যদিও বছরের শুরুতে রপ্তানি প্রবণতা ইতিবাচক ছিল, বছরের শেষ দিকে তা নেতিবাচক হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য ভালো লক্ষণ নয়’ বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিকেই দায়ী করেন, যা কিছু রপ্তানিকর্তাকে সুবিধা নেওয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে স্থানান্তরিত করেছে। তিনি বলেন, ‘একই সময়ে মার্কিন বাজারেও রপ্তানি ভালো অবস্থায় নেই। আমাদের প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন করা।’ আইএইচও/এএসএ/এমএফএ/এমএস