বরখাস্ত হওয়ার আগেই ‘বলির পাঁঠা’ ভাবছিলেন আমোরিম: বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞ

সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পক্ষ থেকে বরখাস্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার অনেক আগেই রুবেন আমোরিম নিজের আবেগের সঙ্গে এক অসম লড়াই লড়ছিলেন। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞ ড্যারেন স্ট্যানটনের মতে, শেষ ও বিস্ফোরক সংবাদ সম্মেলনে পর্তুগিজ এই কোচ স্পষ্টভাবেই এমন ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে ক্লাবের শীর্ষ কর্তারা তাকে কার্যত ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়েছেন।দুই মৌসুম পূর্ণ হওয়ার আগেই ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৪০ বছর বয়সী আমোরিমের অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রকাশ্যে ক্লাবের রিক্রুটমেন্ট নীতি ও সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গত রাতে (৪ জানুয়ারি) লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্রয়ের পর তার কথাবার্তাই শিরোনাম দখল করেছিল, তবে তার অঙ্গভঙ্গি ও মুখভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—উর্ধ্বতনদের কাছ থেকে তিনি নিজেকে একা ও প্রতারিত মনে করছিলেন।বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞ স্ট্যানটন আমোরিমের শেষ সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানান, সেখানে এমন একজন মানুষের ছবি ফুটে ওঠে, যিনি বুঝে গিয়েছিলেন—শেষটা খুব কাছেই। সবচেয়ে কঠোর মূল্যায়নে বলা হয়, স্পোর্টিং সিপির এই সাবেক কোচ আইএনইওএস–নেতৃত্বাধীন মালিকপক্ষের কাছ থেকে নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করছিলেন। তিনি যে প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলেন বলে ভেবেছিলেন, সেটির শোকই যেন করছিলেন—বাস্তবতার নয়।স্ট্যানটন ওএলবিজি’কে বলেন, ‘আমোরিম এই পরিস্থিতির দায় তার দলের ওপর চাপাচ্ছেন না। তাকে এমন একজন মানুষের মতো দেখাচ্ছিল, যাকে আদালতে জেরা করার জন্য সামনে আনা হয়েছে—যেসব বিষয়ে তার দোষ নেই। আমার মনে হয় তিনি নিজেকে প্রতারিত ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার মনে করেছেন। মূল অনুভূতিটাই ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। তার মনে হয়েছে, তাকে একেবারে বাসের নিচে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।’ আরও পড়ুন: কোচের পদ থেকে আমোরিমকে বরখাস্ত করেছে ম্যান ইউনাইটেডদলবদল নীতি ও ৩-৪-৩ ফর্মেশনে তার অনড় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই কক্ষে টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক সাংবাদিক যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে চাপ দেন, তখন আমোরিমের মুখোশ খুলে যায়। স্ট্যানটনের মতে, তিনি বিষয়টি এড়াতে চাইলেও তার মুখে 'তীব্র রাগের ঝলক' স্পষ্ট ছিল—যা সাধারণ হতাশার চেয়েও বেশি।স্ট্যানটন ব্যাখ্যা করেন, ‘আমোরিমের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে যায়, ভ্রু নেমে আসে। মুখভঙ্গিটা যেন বলছে—আমি বলে দিয়েছি, এবার এগিয়ে যান। এই বিষয়টা নিয়ে কোণঠাসা হওয়ায় সে ভীষণ বিরক্ত।’সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল একটি ক্ষণিকের অভিব্যক্তি, যা অনেকেই খেয়াল করেননি। বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন চলতে থাকায় একসময় আমোরিমের মুখে একপাশে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তার মুখে আমরা একটা কুটিল হাসি দেখি। এটা অবজ্ঞার প্রকাশ। একে বলা হয় একপাক্ষিক বা দ্বিপাক্ষিক হাসি। এটা এক ধরনের অজান্তে বেরিয়ে আসা সংকেত। মুখের একপাশে হাসি মানে অবজ্ঞা—এক্ষেত্রে আমোরিম যেন বলছেন, তিনি যা বলার বলে ফেলেছেন, কিন্তু এখন আর কেউ তার কথা শুনছে না।’যে সাংবাদিককে আমোরিম ব্যঙ্গ করে ‘খুব স্মার্ট’ বলেছিলেন, সেই মুহূর্তটাকেই টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করেন স্ট্যানটন। তার মতে, এটি ছিল দুর্বলতা স্বীকারের মতো—কারণ সাংবাদিক এমন জায়গায় আঘাত করেছিলেন, যেখানে ক্লাব তাকে উন্মুক্ত রেখেছিল।স্ট্যানটন বলেন, ‘সাংবাদিককে “খুব স্মার্ট” বলা মানে স্বীকার করা—প্রশ্নগুলো খুব কাছাকাছি চলে আসছিল। সেগুলো ঠিক নিশানায় লাগছিল, স্নায়ুতে আঘাত করছিল। আমোরিম তখন মানসিকভাবে যেভাবে অনুভব করছিলেন, সেই মুহূর্তে এসব ছিল একেবারেই ভুল প্রশ্ন।’চাকরির মানসিক চাপ তার কপালেই স্পষ্ট ছিল। বিশেষজ্ঞ যে ‘ভাঁজ পড়া রেখা’ লক্ষ্য করেছেন, তা রাগ ও হতাশার মিশ্রণের ইঙ্গিত দেয়। এটি ছিল এক অনুশোচনায় ভরা মানুষের চেহারা—নিজের কাজের জন্য নয়, বরং যে পরিস্থিতিতে তিনি পড়েছিলেন, তার জন্য।স্ট্যানটন উপসংহারে বলেন, ‘সে একদমই সুখী মানুষ নয়। মানসিকভাবে সে খুব ভালো অবস্থায় নেই।’ আরও পড়ুন: এমএলএসের সেরা গোলরক্ষক ও আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারকে দলে ভেড়াল ইন্টার মায়ামিসব মিলিয়ে, তার শরীরী ভাষাই প্রমাণ করেছিল—ম্যানেজার ও ক্লাবের সম্পর্ক মেরামতের অযোগ্যভাবে ভেঙে পড়েছে। শেষ মুহূর্তগুলোতে যে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ তিনি অনুভব করেছিলেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত তার বরখাস্তে রূপ নিয়েছে। এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আবারও নতুন একজন ত্রাণকর্তা খুঁজবে, আর আমোরিমকে গুনতে হবে এমন এক সিদ্ধান্তের মূল্য—যে সিদ্ধান্ত অনেক আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত এনে দিয়েছে শুধু হতাশা।শেষ ঘণ্টাগুলোতে তার কপালেই কাজের শারীরিক ও মানসিক চাপ লেখা ছিল। বিশেষজ্ঞের মতে, সেই ভাঁজ পড়া রেখাগুলো রাগ ও ‘ভেতরের তোলপাড়’-এর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এটি ছিল অনুশোচনায় ভরা এক মানুষের চেহারা—নিজের কাজের জন্য নয়, বরং ক্লাবের কাছ থেকে যে প্রত্যাশা নিয়ে তিনি এসেছিলেন, তা পূরণ না হওয়ার জন্য।স্ট্যানটন শেষ কথা বলেন, ‘আমোরিমকে অনুশোচনায় ভরা একজন মানুষ মনে হচ্ছিল, কারণ মাঠে কিংবা ক্লাবের কাছ থেকে তিনি যা আশা করেছিলেন—যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে আনা হয়েছিল—সবকিছুই ভিন্ন পথে গেছে। সে মোটেও সুখী নয়। মানসিকভাবে সে খুব খারাপ অবস্থায় আছে।’