তারেক রহমানের সাদা শার্ট রাজনীতির মাঠে কী বার্তা দেয়?

রাজনীতিতে অনেক কিছুই বলা হয় শব্দে। কিন্তু কিছু বার্তা উচ্চারিত হয় নিঃশব্দে, পোশাকের মাধ্যমে।বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানকে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রঙেই বেশি দেখা গেছে— সাদা। রাজনৈতিক সভা, জনসভা, নির্বাচনী প্রচারণা, গ্রেফতার–পূর্ব সময়, নির্বাসনে লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্স, এমনকি দেশে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্সেও তার পোশাকের কেন্দ্রে ছিলো সাদা রঙ। তাকে কখনো সাদা টি–শার্ট, কখনো সাদা শার্টের সঙ্গে বিভিন্ন রঙের ব্লেজারে দেখা গেছে।রাজনীতিবিদদের পোশাকের এই ধরনের ধারাবাহিকতা সাধারণত কাকতালীয় হয় না। বরং এর মাধ্যমে একটি সচেতন বা অবচেতন রাজনৈতিক ইমেজ নির্মাণ হয়।সাদা পোশাক তারেক রহমানের ক্ষেত্রে কেবল একটি রুচির প্রকাশ নয়, এটি সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা একটি ভিজুয়াল সিগনেচারও। ফ্যাশন ও ইমেজ বিশ্লেষকদের মতে, কোনো নেতা যখন বারবার একই রঙ বা স্টাইল ব্যবহার করেন, তখন সেটি ধীরে ধীরে তার পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। দর্শক অবচেতনে সেই রঙকে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। তারেক রহমানের সাদা পোশাক সেই কাজটিও করছে। জনসভায় বক্তৃা দিচ্ছেন তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীতফ্যাশন সেমিওটিক্স, অর্থাৎ পোশাকের সামাজিক অর্থ বিশ্লেষণের ভাষায়, সাদা রঙ মানে কেবল সৌন্দর্য নয়। এটি ইঙ্গিত করে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে। এছাড়া সাদা রঙ নিজের দিকে নজর টানে না; বরং দর্শকের চোখ সরিয়ে দেয় বক্তার মুখ, ভাষা ও বক্তব্যের দিকে। ফলে নেতা ও দর্শকের মধ্যে পোশাকজনিত কোনো দূরত্ব তৈরি হয় না। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীতমনোবিজ্ঞানে Enclothed Cognition নামে একটি ধারণা রয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষ যে পোশাক পরে, তা তার আচরণ ও মানসিক অবস্থাকেও প্রভাবিত করে। সাদা রঙকে যেহেতু পরিচ্ছন্নতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে সাদা পোশাক শুধু দর্শকের কাছে নয়, নেতার নিজের ভেতরেও দায়িত্বশীলতা ও সংযমের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। আরও পড়ুন: নির্বাসন থেকে নেতৃত্বে ফেরেন যেসব বিশ্বনেতাভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতিবিদদের সাদা পোশাক পরার ইতিহাস অনেক গভীর শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী যখন স্বদেশীর স্লোগান দিয়েছিলেন, তখন মানুষ বিদেশি কাপড় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জনগণকে চরকা থেকে তৈরি খাদি কাপড় পরতে উদ্বুদ্ধ করেন। গান্ধী এটিকে স্বনির্ভরতা, স্বদেশি চেতনা, অহিংসার প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী। ছবি: সংগৃহীত আজও উপমহাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা সাদা পোশাকেই নিজেদের সবচেয়ে ‘গ্রহণযোগ্য’ রূপে হাজির করেন। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাদা রঙ মানে- “আমি ক্ষমতার অংশ হলেও, আমি তোমাদের মতোই।” স্টিভ জবস। ছবি: সংগৃহীতরাজনীতিতে পোশাকের মাধ্যমে বার্তা দেয়ার ধারণা শুধু উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব রাজনীতিতেও পোশাক একটি শক্তিশালী বার্তা–বাহক। স্টিভ জবসের কালো টার্টলনেক যেমন কর্পোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের উদাহরণ, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ধারাবহিকভাবে ব্যবহৃত পোশাক স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে।ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জলপাই–সবুজ সামরিক স্টাইলের পোশাক পরছেন। এটি তার যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার প্রতীক।জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের একরঙা প্যান্টস্যুট তার ধারাবাহিকতা ও নিয়ন্ত্রিত নেতৃত্বের পরিচয় বহন করত। ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি: সংগৃহীতমার্গারেট থ্যাচারের শক্ত কাঠামোর স্যুট ও মুক্তার মালা তাকে আইরন লেডি বা লৌহমানবী ইমেজে পরিণত করেছিল। মার্গারেট থ্যাচার। ছবি: সংগৃহীতমিশেল ওবামার বেগুনি পোশাককে অনেক সময় ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- দুই রাজনৈতিক ধারার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।রাজনীতিতে শব্দ বদলায়, স্লোগান বদলায়, সময় বদলায়। কিন্তু কিছু রঙ ইতিহাসে থেকে যায়। মানুষ অবচেতনে মনে রাখে। যে নেতা সাধারণ পোশাকে দীর্ঘ সময় প্রভাব তৈরি করতে পারেন, তিনি নিজেই একটি বার্তা।