নীলফামারীতে আবাদি জমির টপ সয়েল যাচ্ছে ইটভাটায়-সেচ ক্যানেলে

নীলফামারী জেলায় কোটি কোটি কিউবিক ফিট আবাদি জমির টপ সয়েল কেটে ইটভাটা ও সেচ ক্যানেলের পাড় নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। খুব সহজে জমির টপ সয়েল বিক্রি করে লাভবান হওয়া এবং প্রশাসনিক কোনো ধরনের কার্যকর বাধা না থাকায় ব্যাপক হারে চলছে এই মাটি কাটার মহোৎসব।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নীলফামারীর  জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যেখানে সেখানে আবাদি জমির টপ সয়েল কাটার কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের রাস্তার পাশের ফসলি জমির মাটি কেটে বগুড়া সেচ খালে দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।  সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ব্রহ্মত্তর, বটের ঘাট ও তোফাইলের মোড় এলাকায় ফসলি জমির মাঝখানে বড় বড় গর্ত দেখা যায়। কোথাও জমির একাংশ কেটে নেওয়ায় পাশের জমিও দেবে গেছে।  অনুমোদনহীন মাহিন্দ্র ও ট্রাক্টরে করে এসব মাটি নেওয়া হচ্ছে ইটভাটা কিংবা সেচ ক্যানেলের পাড়ে। ইটভাটা ও সেচ ক্যানেলের পাড়ে জমে উঠেছে উর্বর টপ সয়েলের বিশাল স্তূপ। নীলফামারী একটি কৃষি প্রধান জেলা। জেলার অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই হলো কৃষি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। অথচ এই কৃষি প্রধান জেলাতেই বছরের পর বছর কোনো রকম বাধা ছাড়াই চলে আসছে আবাদি জমির টপ সয়েল কাটার মহোৎসব।বৃষ্টি হলেই এসব এলাকার রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী, রোগী ও কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।আরও পড়ুন: নীলফামারীতে ৫৩ লাখ টাকার শোধনাগার, ৫ বছরেও মিলল না এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানিকৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একটি আবাদি জমির মূল পুষ্টিগুণ থাকে উপরের ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি মাটির স্তরে। এই স্তরটি কেটে নেওয়া হলে জমির উর্বরতা কার্যত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাটি কাটা জমিতে চাষের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতি বছর নীলফামারী জেলায় প্রায় ২০ কোটি কিউবিক ফিট টপ সয়েল কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে কৃষি বিভাগের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারী জেলায় বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে মোট ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৫৩টি। এর মধ্যে নীলফামারী সদর উপজেলায় ১১টির মধ্যে বৈধ ১টি, ডোমারে ৪টির মধ্যে বৈধ ১টি, একটি বন্ধ,কিশোরগঞ্জে ২টি, দুটিই হাইকোর্টের রিট নিয়ে চলছে,জলঢাকায় ৫টির মধ্যে বৈধ ২টি,সৈয়দপুরে ৩১টির মধ্যে বৈধ মাত্র ৩টি, ৩টি পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদনকৃত। বিশেষ করে সৈয়দপুর উপজেলায় এককভাবে ৩১টি ইটভাটা থাকায় কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে আশপাশের ফসলি জমিই সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। কৃষকেরা বলেন, টপ সয়েল বিক্রি করে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের জমির উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত। এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,লাভের আশায় মাটি বিক্রি করলেও পরে বুঝতে পারি ক্ষতি কত বড়। জমি কাটার পর আর আগের মতো ফসল হয় না। সেচ দিলে পানি ধরে না। বাধা দিতে গেলে ভয় দেখানো হয়। কামারপুকুর এলাকার কৃষক আব্দুল করিম বলেন,আগে যেখানে একবার সেচ দিলেই চলত, এখন দুই-তিনবার সেচ দিতে হয়। খরচ বেড়ে যাচ্ছে, লাভ তো দূরের কথা। মাটি কাটার ফলে জমির উচ্চতা অসম হয়ে পড়ছে। বোরো মৌসুমে সেচের সময় উঁচু জমির পানি দ্রুত নিচু জমিতে চলে যাচ্ছে, এতে সেচ ব্যবস্থায় মারাত্মক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী জানান,আমরা অনুমতি নিয়ে মাটি কেটে বগুড়া সেচ খালের পাড় নির্মাণ করছি। আমাদের কাছে মাটি কাটার অনুমতিপত্র আছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কাজের নামেও তিন ফসলি আবাদি জমির মাটি নির্বিচারে কাটা হচ্ছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘তিন ফসলি জমির মাটি কাটার কোনো বিধান নাই। কোনো জমির মাটি কাটতে হলে অবশ্যই আমাদের জানাতে হবে।’