নিপাহ ভাইরাস: শুধু খেজুরের রস নয়, যেসব ফলেও রয়েছে এই মরণফাঁদ

শীতের সকালের মিষ্টি রোদে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার চিরায়ত আনন্দ এখন রূপ নিয়েছে প্রাণঘাতী আতঙ্কে। তবে ভয়ের কারণ শুধু খেজুরের রসেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের ৩৫টি জেলায় ছড়িয়ে পড়া নিপাহ ভাইরাস এখন তার রূপ বদলে ফেলেছে।আগে একে কেবল ‘শীতকালীন রোগ’ মনে করা হলেও, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশে শনাক্ত হয়েছে ‘অ-মৌসুমি’ নিপাহ সংক্রমণ। বাদুড়ের মুখ দেয়া আম, জাম বা লিচুর মতো ফল খেয়েও এখন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এই মরণব্যাধিতে। আইইডিসিআর-এর সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র–২০২৫ সালে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল শতভাগ। বুধবার (৭ জানুয়ারি) আইইডিসিআর মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, নিপাহ ভাইরাস এখন আর ঋতুভিত্তিক কোনো রোগ নয়। গত বছরের আগস্ট মাসে নওগাঁর এক ৮ বছরের শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।তদন্তে দেখা গেছে, শিশুটি বাদুড়ের আধা-খোয়া কালোজাম ও আম খেয়েছিল। এটিই দেশের ইতিহাসে প্রথম ‘অ-মৌসুমি’ নিপাহ সংক্রমণ। এর অর্থ হলো, বছরের যে কোনো সময় বাদুড়ের লালা বা মূত্র মিশ্রিত ফল খেলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।আইইডিসিআরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারীতে চারজন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন এবং তাদের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। এমনকি ২০২৪ সালেও ৫ জন আক্রান্তের সবারই মৃত্যু হয়েছিল। আরও পড়ুন: ৩৫ জেলায় নিপাহর থাবা: প্রথম ‘অ-মৌসুমি’ সংক্রমণের খোঁজবিশ্বে নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার যেখানে ৭২ শতাংশ, বাংলাদেশে সেখানে তা ১০০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও নওগাঁ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।গবেষণায় দেখা গেছে, নিপাহ কেবল ফল বা রস থেকেই ছড়ায় না। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা পরিবারের সদস্য বা স্বাস্থ্যকর্মীরাও সংক্রমিত হচ্ছেন।আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বিষয়টিকে ‘বিরাট সতর্কবার্তা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘নিপাহ এখন বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।’নিপাহ ভাইরাসের কোনো কার্যকর টিকা বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই সচেতনতাই একমাত্র পথ। বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে নিম্নলিখিত পরামর্শ দিয়েছেন:* গাছ থেকে পড়ে থাকা বা কোনো প্রাণীর আধা-খোয়া ফল ভুলেও খাবেন না।* খেজুরের কাঁচা রস পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন।* যে কোনো ফল খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন।* আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করুন।ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে সরকারি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোকে জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নিপাহর এই নতুন আচরণ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতাই এখন প্রধান অস্ত্র।