বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধির সাথে সাথে রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাও কীভাবে কাজ করছে, এবং তা কতটা জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকদের অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে, এই বিষয়গুলো এখন আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আয়কর আইনের ধারা ২৬৪ আসলে এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়। এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক এবং প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বলতে বোঝায়, রিটার্ন জমা দেওয়ার রসিদ, সিস্টেম জেনারেটেড সার্টিফিকেট কিংবা উপকর কমিশনারের প্রত্যয়নপত্র। অর্থাৎ কর রিটার্ন এখন শুধু কর আদায়ের উপায় নয়; এটি হয়ে উঠছে নাগরিকের অর্থনৈতিক পরিচয়পত্র।রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ ৪৩ টি খাতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন বলছে, ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, আইআরসি বা ইআরসি সংগ্রহ, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন, গ্যাস–বিদ্যুৎ সংযোগ, পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ নবায়ন, বড় অঙ্কের আমানত বা সঞ্চয়পত্র কেনা, এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ এখন অপরিহার্য। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব আরও বড়। টেন্ডার জমা দেওয়া, বিল অব এন্ট্রি দাখিল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন, কোম্পানির এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ, সবখানেই রিটার্নের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ যে খাতে অর্থের প্রবাহ নিয়মিত, সেই খাতকে রিটার্নের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ আর নেই।তবে আইন ব্যতিক্রমও রেখেছে। সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভায় নতুন ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ, সমবায় সমিতির নিবন্ধন, সাধারণ বিমার তালিকাভুক্ত সার্ভেয়ারের নতুন লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ ও নবায়ন, চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, চার্টার্ড সেক্রেটারি, একচুয়ারি, প্রকৌশলী, স্থপতি, সার্ভেয়ারসহ পেশাজীবী সংস্থার নতুন সদস্যপদ গ্রহণ, ৫ লক্ষাধিক টাকার পোস্ট অফিস সঞ্চয়ী হিসাব খোলা, এমপিওভুক্ত দশম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব কর্মচারীর সরকারি অর্থপ্রাপ্তি, স্বাভাবিক ব্যক্তির এমএফএস, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-ট্রান্সফার বা রিচার্জ কমিশন থেকে আয় গ্রহণ, স্ট্যাম্প ফি, কোর্ট ফি, কার্টিজ পেপার ভেন্ডর বা দলিল লেখকের লাইসেন্স নিবন্ধন ও তালিকাভুক্তি, ত্রি-চক্র মোটরযানের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন, ফিটনেস নবায়ন, ই-কমার্স ব্যবসার লাইসেন্স গ্রহণ এবং স্বাভাবিক ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তি কোনো আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত, নিগমিত বা গঠিত হওয়ার বছরে বা পরের বছরে, এসব ক্ষেত্রেই সিস্টেম জেনারেটেড প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। আর যাদের আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয়, তারা এই বিধানের আওতায় পড়েন না।ধারাটির সবচেয়ে গুরুত্ববহ অংশ হলো দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি। কোনো কর্মকর্তা বা সংস্থা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ যাচাই না করে লাইসেন্স বা অনুমোদন দিলে দায় পড়বে তার ওপরই। প্রয়োজনে উপকর কমিশনার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারবেন, অবশ্যই শুনানির সুযোগ দিয়ে। এ বিধান স্পষ্ট করে যে কর প্রশাসন শুধু করদাতাকেই নয়, বরং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনছে। আরও পড়ুন: আগামী অর্থবছরেই বাধ্যতামূলক হচ্ছে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল: এনবিআর চেয়ারম্যানধারা ২৬৫ অনুযায়ী, যেসব করদাতা আইন মোতাবেক রিটার্ন দাখিল করতে বাধ্য এবং ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদেরকে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এমন স্থানে টাঙিয়ে বা প্রদর্শন করতে হবে যাতে সেটা সবার চোখে সহজে পড়ে। যদি কোনো করদাতা এই নিয়ম মানতে ব্যর্থ হন, তবে উপকর কমিশনার তাকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারবেন।অর্থনীতির ভাষ্যকারেরা বলছেন, “অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে করের নেটওয়ার্কে আনা এখন সময়ের দাবি।” এই বাস্তবতা সামনে রেখে রিটার্ন দাখিলকে একটি সমন্বিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছে। ফলে কর রিটার্ন এখন আর বছরের একবারের রুটিন দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকের আর্থিক কর্মকাণ্ডের বৈধতা, সে যে ব্যবসায়ী হোক বা পেশাজীবী কিংবা বিনিয়োগকারী।ডিজিটাল কর ব্যবস্থার ফলে রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে—কিন্তু নিয়ম-নীতির কঠোরতা বেড়েছে। অমান্য করলে বন্ধ হতে পারে ব্যাংক ঋণ, স্থগিত হতে পারে ব্যবসার লাইসেন্স, থেমে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সুবিধাগুলোও। রাষ্ট্র তাই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে: নিয়মিত রিটার্ন দাখিল কর নেট সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার মূল শর্ত। সারকথা, বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রিটার্ন দাখিল শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের পরিচয়, আর্থিক স্বচ্ছতার প্রতীক এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের নতুন মানদণ্ড। লেখক: ফয়সাল ইসলাম এফসিএ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক। ইমেইল:faysal.aqc@gmail.com