সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত একটি জনপদ। কৃষি ও মৎস্য খাতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও জেলায় কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন আজও হয়নি। দীর্ঘদিনের দাবির মুখে অবশেষে রাস্তা উন্নয়নের কাজ শুরু হলেও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাবনা আজও ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে।সাতক্ষীরার মাটি ক্রীড়াঙ্গনের জন্য উর্বর হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখানে কোনো ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মিত হয়নি। জাতীয় রাজস্ব ভাণ্ডারে অর্থ জোগানে এ জেলা এগিয়ে থাকলেও বরাদ্দ বৈষম্য জেলাজুড়ে তৈরি করেছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার গল্প। বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরবনের বড় অংশ এ জেলায় থাকলেও পর্যটন শিল্পের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা আজও নিশ্চিত হয়নি। প্রায় ২০ লাখ ভোটারের এ জেলার ৮০ শতাংশ মানুষের প্রধান পেশা কৃষি ও মাছ চাষ। দেশের অর্থকরী ফসলের পাশাপাশি সুমিষ্ট হিমসাগর আম ও হিমায়িত চিংড়ি থেকে আসে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু কৃষিভিত্তিক কোনো শিল্প ও হিমাগার গড়ে না ওঠায় কৃষির এই প্রাচুর্য পূর্ণ শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে নিশ্চিত হয়নি পণ্যের ন্যায্য মূল্য, সৃষ্টি হয়নি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানও। সাতক্ষীরা শুধু ধান-চাল, সবজি ও মাছ উৎপাদনেই উদ্বৃত্ত নয়, ক্রীড়াঙ্গনেও সমানভাবে এগিয়ে। ক্রিকেটে মুস্তাফিজুর রহমান ও সৌম্য সরকার এবং নারী ফুটবলে জাতীয় দলের বর্তমান অধিনায়ক আফীদা খন্দকার প্রান্তি ও সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুনসহ বিভিন্ন ইভেন্টে শতাধিক জাতীয় খেলোয়াড়ের বাড়ি সাতক্ষীরায়। সাবেক ফিফা রেফারি তৈয়ব হাসান বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটার সৌম্য, মুস্তাফিজ, নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক আফীদা ও সাবেক অধিনায়ক সাবিনা এবং টানা ১৬ বারের দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তারসহ জাতীয় পর্যায়ের শতাধিক খেলোয়াড়ের বাড়ি সাতক্ষীরায়। এই মাটি ক্রীড়াঙ্গনের জন্য উর্বর হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ক্রীড়া কমপ্লেক্স হবে হবে করে আজও হয়নি।’ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে না ওঠায় বিনিয়োগের সুযোগ থেকেও দূরে সরে রয়েছে সাতক্ষীরা। বারবার উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা জেলার তালিকায় নাম লেখাতে হয়েছে এ জেলাকে। নদী ভাঙন আর জলাবদ্ধতা মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে অনিশ্চয়তা। আরও পড়ুন: সাতক্ষীরার ৪টি আসনে ১০ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল, বৈধ ১৯ জেলা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আজাদ হোসেন বেলাল সুশীল সমাজের পক্ষে দাবি জানিয়ে বলেন, ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ পানি নিষ্কাশনের জন্য সরকারি নদী ও খাল ইজারা বন্ধ করা প্রয়োজন।’ সংস্কৃতিতেও সাতক্ষীরা জেলা এগিয়ে থাকলেও এখানে গান, আবৃত্তি বা অভিনয় শেখার জন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। টিভি ও রেডিও কণ্ঠশিল্পী আবু আফফান রোজবাবু মনে করেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলে আরও নতুন নতুন শিল্পী তৈরি হতো।’ বরাদ্দ বৈষম্যের শিকার সাতক্ষীরায় বহুদিন ধরেই সমঅধিকার ও সম-উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন চলছে। কিন্তু বড় কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। সাতক্ষীরার ভোমরা শুল্ক স্টেশনকে কাস্টমস হাউস ঘোষণা এবং দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ জেলার উচ্চশিক্ষার বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এ বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক ও উন্নয়ন গবেষক মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।’ অন্যদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য জমিদার বাড়ি, ইতিহাসসমৃদ্ধ স্থাপনা, পীরে কামেল হযরত খান বাহাদুর আহছানউল্লা (র.)-এর জন্মভিটা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন পর্যটনে উন্মোচন করতে পারে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার। সেই নতুন সম্ভাবনার গল্প লেখার অপেক্ষায় আজও দাঁড়িয়ে আছে সাতক্ষীরা।