চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হওয়া পানি শোধনাগারটি ৫ বছরেও চালু হয়নি। ফলে বিশুদ্ধ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পৌর এলাকার অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় শোধনাগারটি এখন পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত স্থাপনায় বলে জানান স্থানীয়রা।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শেওলা, আগাছা, ময়লা-আবর্জনায় ভরা পানি জীবননগরের পৌর পানি শোধনাগার ও পাম্প হাউজগুলো। হস্তান্তরের পর একদিনও চালু হয়নি। দীর্ঘ দিন পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা। শোধনাগার ও পাম্প হাউজ চালানোর জন্য লোকবল সংকট, বিদ্যুৎবিল, সংযোগ লাইন সম্প্রসারণ না হওয়ায় ও অর্থের ব্যবস্থা না থাকায় বন্ধ রয়েছে। উচ্চবিলাসি প্রকল্প নিলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।জীবননগর পৌর এলাকার সাধারণ মানুষ বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর্সেনিক ও আয়রন যুক্ত পানি পান করতে হচ্ছে। ফলে তাদের প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য-ঝুঁকির মধ্য পড়তে হচ্ছে। পৌর কর্তৃপক্ষ শোধনাগার চালুর বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে বারবার তাগাদা দিলেও তাতে কোনো ফল আসেনি।সূত্র জানায়, চুয়াডাঙ্গা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ৪৫ পৌর সভা থানা গ্রথ সেন্টার প্রকল্পের আওতায় পানি শোধনাগার ও পাম্প হাউজ নির্মাণ করে। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌরসভার আওতায় এটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। চার কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে শোধনাগার, পাম্প হাউজ নির্মাণ করা হয়। ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০০ পাইপ লাইনের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করা হয়। লাইনগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।আরও পড়ুন: ৬ বছর ধরে বন্ধ পানি শোধনাগার, মহেশপুরে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে ‘টিউবওয়েলের পানি’স্থানীয়রা জানান, পৌর এলাকার ৩০০টি পরিবার প্রথম পর্যায়ে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও পায়নি। শুধুমাত্র অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। জীবননগরের পৌর পানি শোধনাগার ও পাম্প হাউজগুলোতে জমেছে শেওলা, আগাছা, ময়লা ও আবর্জনা। ছবি: সময় সংবাদ৪৫ পৌরসভা থানা গ্রথ সেন্টারে রয়েছে তিনটি পাম্প হাউজ ও একটি শোধনাগার। একটি পাম্প হাউজ ও মূল পানি শোধনাগার রয়েছে পৌরসভার ভেতর। জীবননগর পৌর এলাকার নারায়ণপুর সরকারপাড়া ও জীবননগর হাই স্কুলপাড়ায় রয়েছে দুটি পাম্প হাউজ। এগুলো কয়েক বছর পড়ে থেকে অচল অবস্থায় রয়েছে। লতা-পাতা আর আগাছায় ভরা পাম্প হাউজগুলো। নির্মাণের পর কোনো কোনো খোলা হয়নি।পাম্প হাউজগুলো থেকে পানি শোধনাগারে আসার পর ফিল্টার ও প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে। সরাসরি পাম্পগুলো থেকে জরুরি মুহূর্তে পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে। হস্তান্তরের পর পানি শোধনাগার চালুর সব আয়োজন থাকলেও ৫ বছরে চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।আরও পড়ুন: ছেঙ্গারচর পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যাহত, দুর্ভোগে বাসিন্দারাকয়েক মাস আগে সুইপারদের আবাসনের ব্যবস্থ্য করা হয়েছে দোতলা ভবনটি। সেখানেই ৮টি পরিবার বসবাস করছে। আর মাদকাসক্তদের মাদক সেবনের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে উঠেছে। দিনে ও রাতে তারা সেখানে নিয়মিত মাদকসেবন করে। চারপাশ ময়লা, আবর্জনা, আর আগাছায় ভরে রয়েছে।প্রকল্পের আওতায় ৩০০ বাড়িতে পানি সরবরাহের জন্য পাইপের মাধ্যমে সংযোগ লাইন দেয়া হয় প্রথম পর্যায়ে। পরে পৌর কর্তৃপক্ষ নিজ অর্থায়নে ২০০ সংযোগ লাইন দেয় গ্রাহকদের। ৫০০ সংযোগ লাইন স্থাপন করা হয়। গোপালগঞ্জের মনির ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি সম্পন্ন করে। প্রতি ঘণ্টায় দুই লাখ লিটার পানি শোধন করে গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি।দীর্ঘ দিন পড়ে থেকে চুরি আর নষ্ট হয়েছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। প্রকল্পটি আর কোনোভাবেই চালু করা সম্ভব নয়। চার কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হওয়া জীবননগর পৌর পানি শোধনাগার ৫ বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি।আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জের পানি শোধনাগার চ্যানেলে চর, চ্যালেঞ্জের মুখে ৩৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্পএ বিষয়ে জীবননগর পৌর এলাকার বাসিন্দা তুহিন বলেন, ‘পৌরবাসী আর্সেনিক ও আয়রন যুক্ত পানি পান করছি নিয়মিত। পানি শোধনাগার নির্মাণ হলেও তা এখনও পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছে প্রতিনিয়ত। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের কাছ থেকে সংযোগ লাইন দেয়ার জন্য টাকাও নিয়েছে। দ্রুত সময়ে এটি চালু হোক।’জীবননগর দৌলৎগঞ্জপাড়ার মিন্টু মিয়া জানান, সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পানি শোধনাগার নির্মাণ করলেও সেটি কাজে আসছে না। এখন পৌরবাসীর গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। একেবারে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যারা প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক।এ বিষয়ে জীবননগর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আবুল কাশেম জানান, নানা জটিলতা থাকায় পানি শোধনাগারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালেও চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সুইপারদের আবাসন না থাকায় এখানে আমরা থাকতে দিয়েছি। চালুর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে, নয়তো চালু করা সম্ভব হবে না।