ভারতে মুসলিমরাই কেন বারবার বুলডোজার নীতির শিকার?

দক্ষিণ দিল্লির জঙ্গপুরা ও গোবিন্দপুরীতে সম্প্রতি মাদ্রাসি ক্যাম্প ও ভূমিহীন ক্যাম্প নামে পরিচিত দুটি শ্রমজীবী বসতি উচ্ছেদকে ঘিরে ভারতের রাজধানীতে আবারও ফিরে এসেছে প্রায় পাঁচ দশক আগের তুর্কমান গেটের স্মৃতি। নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ বুলডোজারের গর্জন, পুলিশের উপস্থিতি এবং ধ্বংসাত্মক উচ্ছেদ—সব মিলিয়ে ইতিহাস যেন নতুন করে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। ১৯৭৬ সালের এপ্রিল। ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। নাগরিক অধিকার স্থগিত, চারদিকে দমন-পীড়নের সময়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী ‘সৌন্দর্যায়ন’ অভিযানের নামে পুরান দিল্লির তুর্কমান গেট এলাকায় বুলডোজার নামান। অগ্রগতির মোড়কে চালানো সেই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল শ্রমজীবী, মুসলিম-অধ্যুষিত একটি এলাকা। বহু বাসিন্দার শিকড় ছিল মুঘল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। সে সময় এই উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠলে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। অসংখ্য পরিবার ঘরছাড়া হয়। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা আসেনি। চলতি মাসে ভারতে সেই জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূরণ হচ্ছে। জরুরি অবস্থা শেষ হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত। সময় গড়িয়ে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি। এদিন ভোরে দক্ষিণ দিল্লির জঙ্গপুরার মাদ্রাসি ক্যাম্পে ঢোকে বুলডোজার। পুলিশি বুটের শব্দে ঘুম ভাঙে বাসিন্দাদের। অনেকের অভিযোগ, যথাযথ উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়নি; কেউ কেউ বলেন, মাত্র একদিন আগে তারা সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। দুপুরের মধ্যেই শত শত মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। নারীরা জিনিসপত্র আঁকড়ে ধরেন, শিশুদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ভাঙা ঘরের ধ্বংসস্তূপের পাশে। পরদিন (২ জুন, ২০২৫) গোবিন্দপুরীর কাছে ভূমিহীন ক্যাম্পে পৌঁছায় উচ্ছেদকারী দল। দিল্লি হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চে উচ্ছেদ স্থগিতের আবেদন শুনানির ঠিক কয়েক মিনিট আগেই দুই আবেদনকারীর ঘর ভেঙে ফেলা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো বসতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়—যেখানে থাকতেন দিনমজুর, অভিবাসী শ্রমিক, গৃহকর্মী ও স্যানিটেশন কর্মীরা। দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এসব বসতি ‘দখল করা’ প্লাবনভূমির জমিতে গড়ে উঠেছিল। তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, নোটিশ ছিল অপর্যাপ্ত, পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না—যা পুনর্বাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে আদালতের একাধিক নির্দেশের পরিপন্থি। ১৯৭৬ সালে ‘অগ্রগতির পথে বাধা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল প্রাচীরঘেরা শহরের মুসলিমদের। ২০২৫ সালে সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন শহরের দরিদ্র অভিবাসী শ্রমজীবীরা—মাদ্রাসি ক্যাম্প ও ভূমিহীন ক্যাম্পের বাসিন্দারা। তখন বলপ্রয়োগ ও আমলাতন্ত্রের ভরসায় কাজ করেছিলেন সঞ্জয় গান্ধী। আজ ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশ’ দেখিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্ছেদ অভিযানে তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা, দলিত বস্তি ও আন্দোলনকারীরা। ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার লখনৌয়ের আকবরনগরে ৫০ বছর পুরোনো মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় ১ হাজার ৮০০র বেশি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়; ঘরছাড়া হন আনুমানিক ১০ হাজার মানুষ। ২০২২ সালের জুনে প্রয়াগরাজে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় আফরিন ফাতিমার বাড়িও ভেঙে ফেলা হয়। কর্তৃপক্ষ এটিকে অবৈধ স্থাপনা বললেও তার বাবার গ্রেফতারের কয়েকদিনের মধ্যে উচ্ছেদ হওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ ওঠে। ভারতে একসময় গণতন্ত্র স্থগিত করে ব্যাপক উচ্ছেদ চালাতে হয়েছিল। আজ, প্রকাশ্য দিবালোকেই চলছে তাণ্ডব। দেশটিতে নির্মাণের প্রতীক বুলডোজার ক্রমেই যেন পরিণত হচ্ছে ধ্বংসের অস্ত্রে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফকেএএ/