রাতের আঁধারে পুকুর খনন, রাজশাহীতে আবাদি জমি কমেছে ১৬ হাজার হেক্টর

নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাণিজ্যিক মাছের পুকুর ও কংক্রিট স্থাপনা বিস্তারের কারণে রাজশাহীতে দ্রুত হারে কমে যাচ্ছে উর্বর আবাদি জমি। এতে খাদ্যনিরাপত্তা, মাটির উর্বরতা ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল নজরদারি ও আইন প্রয়োগের অভাবই এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় মোট আবাদি জমি কমেছে ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও নির্মিত এলাকা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার ফলে স্থায়ীভাবে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। জরিপের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টর। অন্যদিকে বসতবাড়ি, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ নির্মিত এলাকা বেড়ে হয়েছে ৬২ হাজার ৭২৭ হেক্টর, যা ২০১৫ সালে ছিল ৫৪ হাজার ২৩৩ হেক্টর। মাছ চাষে লাভ বেশি, ধান ছাড়ছেন কৃষকরা সরকারি কর্মকর্তা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহীর বহু উচ্চ ফলনশীল কৃষিজমি বাণিজ্যিক মাছের পুকুরে রূপান্তর করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি মৃত্তিকা সংরক্ষণ নীতিমালা ও কৃষিজমি সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন, ২০১৮ লঙ্ঘন করে করা হচ্ছে। জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ২৭৫টিতে। বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে কৃষক ও এনজিও কর্মকর্তারা বলছেন, নিবন্ধনহীন ও অবৈধ পুকুরের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। গত অর্থবছরে রাজশাহীতে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৮৪ হাজার ৮০৩ মেট্রিক টন, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ছিল মাত্র ৫২ হাজার ৬৩ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কৃষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপের কারণেই অনেক জমির মালিক কৃষি ছেড়ে মাছচাষে ঝুঁকছেন। কারণ বোরো ধানসহ প্রচলিত ফসলের তুলনায় মাছচাষে লাভ অনেক বেশি। গোদাগাড়ী উপজেলার এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ধান চাষ করে বছরে বড়জোর ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু একই জমি পুকুরের জন্য লিজ দিলে বছরে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাওয়া যায়।’ একই উপজেলার ৪০ বিঘা জমিতে সম্প্রতি পুকুর খনন করা এক মালিক জানান, ফসল উৎপাদনের তুলনায় মাছচাষ থেকে লাভ কয়েকগুণ বেশি। রাতের আঁধারে খনন, সিন্ডিকেটের ছত্রছায়া বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কৃষিজমিতে পুকুর খননের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের যাচাই শেষে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়া প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে পুকুর খনন করা হয়, যাতে প্রশাসনের নজর এড়ানো যায়। কৃষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা অবৈধভাবে পুকুর খনন করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব সিন্ডিকেট আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন বিএনপি ও তাদের যুব ও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এতে জড়িত।’ এদিকে রাজশাহীর মাছ ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম দামে জমি লিজ পাওয়া যায় এমন আশপাশের জেলাগুলোতে ঝুঁকছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেখানে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লিজে কৃষিজমিতে পুকুর খনন করা যায়, রাজশাহীতে সেখানে লিজ দিতে হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কৃষক নিহত অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে সহিংস ঘটনাও ঘটছে। গত ১৭ ডিসেম্বর, মোহনপুর উপজেলার বড় পালশা গ্রামে গভীর রাতে অবৈধ পুকুর খননের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহমেদ জুবায়ের (২২) নামে এক কৃষক এক্সকাভেটরের নিচে চাপা পড়ে নিহত হন। একই গ্রামের কৃষক জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘বিলের মাঝখানে পুকুর খনন হলে আশপাশের জমিতে পানি জমে যায়। তখন আর চাষ করা সম্ভব হয় না।’ কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, পুকুর খননের সময় উর্বর উপরিভাগের মাটি উঠে গিয়ে নিচের অনুর্বর মাটি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভবিষ্যতে কৃষিকাজে ফিরলেও জমি আর আগের মতো উৎপাদনক্ষম থাকে না। এছাড়া অপরিকল্পিত খননের ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র জলবায়ু পরিবর্তিত হয় এবং ফসলের রোগবালাই বাড়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল বাকী বরকতুল্লাহ বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের জন্য লাভজনক হলেও কৃষিজমিকে পুকুরে রূপান্তর করা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবনমান ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্যার জন্য মারাত্মক হুমকি।’ প্রশাসনের পদক্ষেপ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার বলেন, ‘পুকুর খননের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়। অবৈধ ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয় না।’ তিনি জানান, অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও রাতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এফএ/এমএস