বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায়। এই তেল সম্পদই এখন দেশটির বিপদের কারণ। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এনে গত কয়েক মাস ধরে দেশটি ঘিরে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে নানা হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। প্রতিক্রিয়ায় মাদুরো সরকার জানায়, তেলের মজুদ দখল করতেই ভেনেজুয়েলায় হামলা করতে চায় ওয়াশিংটন।কয়েক মাসের হুমকি-ধামকির অবশেষে গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) গভীর রাতে ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করে মার্কিন বাহিনী। রাজধানী কারাকাস ছাড়াও কয়েক শহরে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে এবং মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে হেলিকপ্টার এরপর জাহাহে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নিউইয়র্কে। সেখানকার সবচেয়ে কুখ্যাত কারাগারে তাদের রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, এখন থেকে ভেনিজুয়েলা চালাবে আমেরিকা। সেই সঙ্গে এর তেলভাণ্ডারের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করেন। পাশাপাশি দ্রুতই তেলের উৎপাদন ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণ শুরুর করার কথাও জানান। আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় ফেরার প্রতিশ্রুতি মাচাদোর, চান দ্রুত নির্বাচন মাদুরোর অপহরণের পরদিনই তথা গত রোববার (৪ জানুয়ারি) এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের পাশে বসেই মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক বলেন, ‘ইস্পাত, খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ সব খনিজ সম্পদ ভেনেজুয়েলায় রয়েছে। খনি শিল্পে দেশটির এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, যা এখন জীর্ণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ঠিক করে ফেলবেন এবং সেই ইতিহাস ফিরিয়ে আনবেন’। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ ভেনেজুয়েলার রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ। যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। যা যুক্তরাষ্ট্রের মজুদের প্রায় পাঁচগুণ। যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুদ প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ব্যারেল। ভেনেজুয়েলা পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাক, ইরান, কুয়েত ও সৌদি আরবের পাশাপাশি ওপেক প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার তেলের মজুদের বড় অংশ রয়েছে দেশের পূর্বাঞ্চলের ওরিনোকো বেল্টে, যা প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অঞ্চলটি। ওরিনোকো বেল্টের তেল অত্যান্ত আঠালো ও ভারী হওয়ায় এর উত্তোলন ও পরিশোধন সাধারণ তেলের তুলনায় ব্যয়বহুল। ফলে এটি অন্য তেলের তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়। এই অঞ্চল থেকে তেল পরিশোধনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন যা যুক্তরাষ্ট্রের আছে, বিশেষ করে টেক্সাস ও লুইসিয়ানা রাজ্যে। ভেনেজুয়েলার তেল কারা ক্রয় করে? একসময় ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করত। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, বিনিয়োগের অভাব ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদন কমে যায়। ২০২৪ সালে দেশটির গড় তেল উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ৯ লাখ ৫২ হাজার ব্যারেল। ওই বছর বিদেশে তেল বিক্রি করে ভেনেজুয়েলার আয় হয় প্রায় ১৭.৫২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে চীন ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। মোট রফতানির প্রায় ৮২ শতাংশ। আরও পড়ুন: মার্কিন হামলায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন: ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন সামরিক অবরোধ শুরু হওয়ার আগে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন ৯ লাখ ৫২ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করে। এর মধ্যে ৭ লাখ ৭৮ হাজার ব্যারেল যায় চীনে। যা ভেনেজুয়েলার তেল রফতানির ৮১.৭ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার তেলের ১৫.৮ শতাংশ রফতানি হয় দেশটিতে। ২.৫ শতাংশ তেলে যায় কিউবায়। প্রাকৃতিক গ্যাস তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতির গ্যাসেরও বড় মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের দিক থেকেও তারা বিশ্বে নবম। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির গ্যাস মজুদ প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার, যা লাতিন আমেরিকার মোট গ্যাস মজুদের প্রায় ৭৩ শতাংশ। এর প্রায় ৮০ শতাংশই তেল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত গ্যাস। স্বর্ণ ও মূল্যবান খনিজ ভেনেজুয়েলায় লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্বর্ণভাণ্ডার রয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির স্বর্ণের মজুদ প্রায় ১৬১ মেট্রিক টন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সরকারি হিসাবে, ভেনেজুয়েলার অনাবিষ্কৃত স্বর্ণের মজুদ আরও অনেক বেশি হতে পারে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটির কাছে অন্তত ৬৪৪ মেট্রিক টন স্বর্ণ থাকার কথা বলা হয়। এছাড়া ওরিনোকো মাইনিং আর্ক এলাকায় হীরা, নিকেল, কোলটান ও তামার বড় মজুদের কথা জানিয়েছে সরকার। ভেনেজুয়েলায় আর কি কি খনিজ সম্পদ আছে? ভেনেজুয়েলার ২০১৮ সালের মিনারেলস ক্যাটালগের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লার মজুদ, ১৪.৬৮ বিলিয়ন মেট্রিক টন আকরিক লৌহ, প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন নিকেল, প্রায় ৯৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন বক্সাইট, এক হাজার মিলিয়নের বেশি ক্যারেট হীরার মজুদ রয়েছে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অতি প্রয়োজনীয় খনিজ কোল্টানের বড় মজুদ রয়েছে। কোল্টান স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভেনেজুয়েলায় এটা ‘ব্লু গোল্ড’ নামেও পরিচিত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে তেলের বাইরে এসব খনিজ সম্পদই ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে পারে। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা