৫০০ টাকার ভ্যাকসিন ২০০০ টাকা, রাজবাড়ীতে জিম্মি জলাতঙ্ক রোগীরা

রাজবাড়ীতে গত এক মাস ধরে জীবনরক্ষাকারী র‌্যাবিস (জলাতঙ্ক) ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালসহ ৫টি উপজেলার কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ফার্মেসিতে মিলছে না এই জরুরি টিকা। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হাসপাতাল চত্বরেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র। অভিযোগ উঠেছে, এই চক্রটি নিরুপায় রোগীদের জিম্মি করে ৫০০ টাকার ভ্যাকসিন এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি করছে। জীবনরক্ষাকারী এই ওষুধের অভাবে প্রতিদিন শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম আতঙ্ক ও দিশেহারা অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ফিরে যাচ্ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ভ্যাকসিন সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন করে ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে রোগীরা ভ্যাকসিন নিয়ে আসলে তারা পুশ করে দিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালে ১৩ ডিসেম্বর থেকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতালসহ ফার্মেসিগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে না এই ভ্যাকসিন। তবে ৫০০ টাকার এই ভ্যাকসিন ১০০০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি টাকায় এক‌টি অসাধু চক্রের মাধ্যমে মিলছে। যা অনেক রোগীর সাধ্য বা ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সে‌টিও পাওয়া যাচ্ছে হাসপাতাল কম্পাউন্ডের ভেতরেই। কিন্তু জানে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিকা না পেয়ে শিশু বাচ্চাসহ নারী-পুরুষ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের র‌্যা‌বিস টিকাদান কক্ষের সামনে ভিড় করে হট্টগোল করছে। কক্ষের‌ ভেতরে চেয়ার-‌টে‌বিলে বসে আছেন নার্সরা। এ সময় কেউ কেউ নিজেরাই ভ্যাকসিন নিয়ে এসে নার্সদের মাধ্যমে নিজেদের শরীরে পুশ করে নিচ্ছে। আবার অনেকে টাকা নিয়ে ভ্যাকসিনের খোঁজ করছেন এবং না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করছে। আবার কেউ কেউ সঠিক সময়ে টিকা নিতে না পেড়ে হয়ে পড়ছেন আতঙ্কিত । আরও পড়ুনহাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্কের টিকার সংকট, বিপাকে রোগীরাবিশ্বে ১৫০ দেশে জলাতঙ্ক, আর্থিক ক্ষতি ৮.৬ বিলিয়ন ডলারটাঙ্গাইলে সরকারি হাসপাতালে মিলছে না জলাতঙ্কের টিকা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার ৫টি উপজেলা ও ৩টি পৌরসভার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল এই সদর হাসপাতাল। ১০০ শয্যার হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ভবন নির্মাণের কাজ চললেও, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসক, ওষুধ ও ভ্যাকসিনের সংকটে জর্জরিত। সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীদের ফরিদপুর বা ঢাকায় রেফার করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। রোগীর স্বজন বিথি বিশ্বাস বলেন, আমার মেয়েকে হাসপাতালে ভ্যাকসিন দেওয়া জন্য নিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু তারা বলছেন, ভ্যাকসিন নাই। আগে ১২০ টাকায় ভ্যাকসিন কিনলেও এখন এক নারী তার কাছে ৫০০ টাকা দাবি করছেন। চারজনের একটি গ্রুপের কাছ থেকে ২০০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। মাহফুজা নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, সকাল থেকে ভ্যাকসিনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু হাসপাতাল থেকে জানানো হয় কোনো ভ্যাকসিন নেই। ওই সময় হঠাৎ এক নারী এসে আমাকে জানান যে তিনিও বাইরের এক লোকের কাছ থেকে ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছেন এবং আমিও চাইলে সেখান থেকে নিতে পারি। তিনি বলেন, পরে তার কথা মতো নিচতলায় এক ব্যক্তির কাছে গেলে তিনি জানান, অনেক দূর থেকে এই ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেছেন। ৪ জনের একটি পূর্ণ ডোজের জন্য তিনি ২ হাজার টাকা (জনপ্রতি ৫০০ টাকা) দাবি করেন। আমি ৫০০ টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি সাফ জানিয়ে দেন ভ্যাকসিন নেই। আরও পড়ুনকুকুর আতঙ্কে এলাকাবাসী, হাসপাতালে নেই জলাতঙ্কের টিকাপোষা কুকুর-বিড়ালে আক্রান্তের হার বেশি, ভয়ে বলে না শিশুরা মিলন মিয়া নামের এক অভিভাবক বলেন, ছেলের হাতে কুকুরে কামড় দিয়েছে, কিন্তু হাসপাতালে এসে শুনি ভ্যাকসিন নেই। অথচ হাসপাতালের ভেতরেই ৫০০ টাকার ভ্যাকসিন ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এত টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কেনার সামর্থ্য আমার নেই। এখন ছেলেকে নিয়ে কী করবো বুঝতে পারছি না। সরকারিভাবে ভ্যাকসিনের সরবরাহ থাকলে আমাদের মতো গরিব মানুষদের এমন বিপদে পড়তে হতো না। এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের র‌্যাবিস টিকাদান কেন্দ্রের ইনচার্জ শিরিনা খাতুন বলেন, বর্তমানে ভ্যাকসিনের সরকারি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। রোগীরা বাইরে থেকে গ্রুপ করে ভ্যাকসিন কিনে আনলে আমরা শুধু তা পুশ করে দিচ্ছি। কক্ষের বাইরে কারা যেন এক-দুই হাজার টাকায় ভ্যাকসিন বিক্রি করছে বলে শুনেছি। তবে আমি তাদের চিনি না। আমরা বিষয়টি নজরে রাখছি এবং এমন কাউকে হাতেনাতে ধরতে পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ হান্নান বলেন, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকেই হাসপাতালে র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। বিষয়টি আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি; তারা আমাদের এক মাস পর যোগাযোগ করতে বলেছে। আশা করছি, এক মাস পর সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে খোলা বাজারেও ভ্যাকসিনের সংকট রয়েছে। তবে অতিরিক্ত দামে ভ্যাকসিন বিক্রির বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই এবং এর সঙ্গে হাসপাতালের কোনো কর্মী জড়িত নয়। টিকাদান কর্মীরা রোগীদের শুধু পরামর্শ দেন এবং রোগীরা নিজেরা ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে আনলে তা প্রয়োগের ব্যবস্থা করেন। রুবেলুর রহমান/কেএইচকে/এমএস