চট্টগ্রামের পথের এক প্রান্তে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। শরীরটুকু স্থির, চোখ বন্ধ। তার পাশ ঘেঁষে ছুটে চলেছে গাড়ি। হর্ন, আলো, গতি মিলেমিশে এক নিরন্তর ব্যস্ততা। সময় যেন সেখানে থামে না, বরং গড়িয়ে যায় আরও দ্রুত। কিন্তু সেই স্রোতের মাঝখানে এক টুকরো নীরবতা হয়ে পড়ে থাকেন তিনি। এই দৃশ্য কোনো খবরের ছবি নয়, কোনো ঘটনার দলিলও নয়; এটি সময় আর মানুষের মধ্যকার এক নীরব সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি।এমনই সব শব্দহীন গল্প নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারি মিলনায়তনে শুরু হয়েছে আলোকচিত্রী সৌরভ দাশের প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘দৃষ্টিতে সৃষ্টি’। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে স্থান পেয়েছে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্রী সৌরভ দাশের ক্যামেরায় ধরা নির্বাচিত সব আলোকচিত্র। সৌরভ দাশের ছবিতে মানুষ ও প্রকৃতি দুটোই আছে, কিন্তু মুখ্য হয়ে ওঠে সময়। ‘স্লো শাটারের’ ভেতর দিয়ে তিনি ধরে আনেন চলমান জীবনের গতি, যেখানে মানুষ কখনো স্পষ্ট নয়, কখনো আলো-ছায়ায় ভেঙে যায় অবয়ব। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া তার ছবিতে স্থিরতা নেই, আছে প্রবাহ। কোথাও মানুষের চলাচল রূপ নেয় রঙের রেখায়, কোথাও আলো নিজেই হয়ে ওঠে চরিত্র। প্রদর্শনীর ছবিগুলো ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, চিত্রশিল্পী ও আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকী, বাফার সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলমসহ চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। প্রদর্শনী ঘুরে দেখার আগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘সৌরভ গত ১৫ বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছে। ষাট বা সত্তরের দশকের আলোকচিত্রীরা যেখানে মূলত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে স্বশিক্ষিত ছিলেন, সেখানে সৌরভ পাঠশালা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে সাংবাদিকতায় এসেছে। দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে সে প্রথম আলোর তিনবার সেরা আলোকচিত্রী হওয়ার পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ করেছে।’ সৌরভ দাশের আলোকচিত্রের মূল্যায়ন করে প্রথম আলো সম্পাদক আরও বলেন, ‘সৌরভ “ভাসমান নায়ক” শিরোনামে একগুচ্ছ ছবি তুলেছে। এই সিরিজে সমাজের এক গভীর বৈপরীত্য উঠে এসেছে। এখানে খোকন নামের এক যুবকের কথা বলা হয়েছে, যে প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা মাথায় করে বহন করে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। কিন্তু দিনশেষে তার নিজের ঘুমানোর কোনো জায়গা নেই; তাকে ফুটপাতে রাত কাটাতে হয়। সাধারণ ও মেহনতি মানুষের জীবনের এই গল্পগুলো তুলে আনার মাধ্যমে সৌরভ মূলত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বা কামরুল হাসানের সেই মেহনতি মানুষের কাছে যাওয়ার দর্শনকেই তুলে ধরেছে।’ আরও পড়ুন: গণমাধ্যম আক্রান্ত মানেই গণতন্ত্র বিপন্ন: ক্র্যাব মতিউর রহমান বলেন, ‘আলোকচিত্র সবসময়ই আমাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিজয়কে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ছবিগুলো নিয়ে আমরা একটা বই প্রকাশ করেছি। ছবিগুলো দেখলে এখনো মনে হয়, কী ধরনের ঘটনা আমাদের এখানে ঘটে গেছে। আর আমাদের আলোকচিত্রীরা সাহস নিয়েই এ ছবিগুলো তুলেছিল। বইটিতে সৌরভ দাশের ১৫টি ছবি রয়েছে।’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু হওয়ার পর তা মানুষের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনে। ফটোগ্রাফি আসার আগে মানুষ ছবি এঁকেই সবকিছু প্রকাশ করত। কিন্তু ফটোগ্রাফি আসার পর মানুষ জগতকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে দেখার সুযোগ পায়। যেমন, আগে দৌড়ানোর সময় ঘোড়ার পা চারদিকে ছড়ানো অবস্থায় আঁকা হতো। কিন্তু ফটোগ্রাফি প্রমাণ করে দিল যে, লাফ দেয়ার সময় ঘোড়ার চার পা এক জায়গায় চলে আসে। একইভাবে ট্রেনের ধোঁয়ার গতির বিষয়েও ফটোগ্রাফি আমাদের দৃষ্টিকে সুনির্দিষ্ট করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফটোগ্রাফির এই নিখুঁত বাস্তবতার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে চিত্রশিল্পীরা ইমপ্রেশনিজম ও এক্সপ্রেশনিজম-এর মতো নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। এদগার মানে, রেনোয়া, পিসারো বা মনের মতো শিল্পীরা তখন বস্তুর হুবহু রূপের বদলে দৃশ্যের ভেতরের ভাব, রঙের খেলা এবং আলোর প্রতিফলনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এভাবে ফটোগ্রাফি এগোতে থাকে।’ নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে আলোকচিত্রী সৌরভ দাশ বলেন, ‘এই প্রদর্শনী কেবল ছবি দেখার আয়োজন নয়। এটি দেখার অভ্যাসকে প্রশ্ন করার, আলো ও সময়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নতুন করে ভাবার এক নীরব মিলনমেলা।’ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও শিক্ষক শোয়েব ফারুকী বলেন, ‘২০১১ সালে ফটোব্যাংক গ্যালারিতে ফটোগ্রাফির বেসিক ক্লাসে সৌরভের সঙ্গে আমার পরিচয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার চোখে ও কৌতুহলে এক ধরনের গভীরতা লক্ষ করি। সৌরভ নিজেকে প্রমাণ করেছে। সে ব্যতিক্রমী একজন আলোকচিত্রী।’