বিসিসিআইয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন জয় শাহ, সঙ্কট কাটবে তো!

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে রোববার ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ। মূলত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ভারতের সফর নিয়ে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। ভারত-নিউজিল্যান্ড প্রথম ওয়ানডের ফাঁকে ভদোদরায় বিসিসিআই কর্তাদের সঙ্গে দেখা করবেন জয় শাহ। বরোদা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ আমন্ত্রণে শহরটিতে অবস্থান করছেন তিনি। হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীদের হুমকির মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয় কেকেআর। যেখানে একা এক মোস্তাফিজকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে ভারত, সেখানে কিভাবে তারা পুরো একটি দলকে বিশ্বকাপের সময় নিরাপত্তা দেবে? রাজনৈতিক শীতল সম্পর্কের কারণে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকই এখন নিরাপদ নন। এসব কারণ সামনে রেখেই আইসিসির কাছে বাংলাদেশের খেলার ভেন্যু ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোথায়, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় নেয়ার কথা জানিয়ে আইসিসির কাচে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে কোনোভাবেই বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না বাংলাদেশ। ভারতীয় মিডিয়া এনডিটিভি বলছে, শুরুতে বিষয়টি ছিল (আইসিসির কাছে চিঠি) একটি সাধারণ ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই এখন সংবেদনশীল কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনে রূপ নিয়েছে। প্রথম দফায় আইসিসিকে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানায়। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কার নামও উল্লেখ করা হয়। তবে দ্বিতীয় চিঠিতে গিয়ে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা নেয়। আইসিসির কাছে বাংলাদেশের দাবি কী? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) স্পষ্ট করে জানায়, এটি কেবল লজিস্টিক বা নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। জাতীয় মর্যাদার বিষয়টিও এখানে জড়িয়ে গেছে। এই অনুভূতির পেছনে আইপিএল থেকে হঠাৎ করে মোস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিসিবি দাবি করেছে, যদি ভারতেই খেলতে হয়, তাহলে বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সদস্যের জন্য ‘ম্যান-টু-ম্যান’ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। খেলোয়াড়, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ ও কর্মকর্তাসহ পুরো বহরই এর আওতায় থাকবে। বার্তাটি পরিষ্কার— এটি এখন শুধু নিরাপত্তা নয়, সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বোর্ডের এই দাবির আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি আইসিসি। জয় শাহের সামনে চ্যালেঞ্জ আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহের প্রথম কাজ হবে বিসিসিআই ও আইসিসির অপারেশন টিমের সঙ্গে বসে বিদ্যমান টুর্নামেন্ট পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পর্যালোচনা করা। কোথায় বাংলাদেশ নিজেকে উপেক্ষিত বা অনিশ্চিত মনে করছে, সেটি চিহ্নিত করাই হবে মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে আইসিসির আগের যোগাযোগগুলো কেবল নিয়মতান্ত্রিক ছিল কি না, নাকি সেখানে সহমর্মিতার ঘাটতি ছিল— সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তবে শুধু কাগজপত্র পর্যালোচনায় সমস্যার সমাধান হবে না। কেন সহজ সমাধান দেখা যাচ্ছে না সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সরাসরি আস্থার জায়গা তৈরি করা। এমন একটি সমাধানে পৌঁছাতে হবে, যাতে বাংলাদেশ কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে— এমন ভাব না তৈরি হয়। স্পষ্ট নিরাপত্তা গ্যারান্টি, স্বচ্ছ যোগাযোগ কিংবা ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত নমনীয়তা— এসবের মধ্য দিয়েই সমাধানের পথ খোঁজা হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। তারা বিশ্বকাপের যোগ্য দল। বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হবে, যার জন্য আইসিসি বোর্ডে ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়বে। এতে আইসিসি ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল— উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের জন্যও এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থান। ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল প্রকাশ্যে বর্তমান পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন এবং বিষয়টিকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই প্রেক্ষাপটে জয় শাহের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকে এখানে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রিকেটের নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে— যিনি উত্তেজনা কমিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন। এটাই এখন হচ্ছে, জয় শাহের সামনে সবচেয়ে কঠিন একটি পরিস্থিতি। আইএইচএস/