ইসলামের ইতিহাসে মিরাজ এমন এক বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যেখানে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু ঊর্ধ্বজগতে আরোহণই করেননি, বরং পথিমধ্যে মানবজীবনের জন্য গভীর শিক্ষা বহনকারী বহু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছেন। এসব দৃশ্য উম্মতের জন্য সতর্কবার্তা, উপদেশ ও আশার আলো হয়ে আজও বিদ্যমান।দুনিয়া ও শয়তানের প্রতীকী আহ্বান রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বোরাকে আরোহণ করে ঊর্ধ্বজগতের দিকে যাত্রা করছিলেন, তখন তিনি পথিমধ্যে এক বৃদ্ধ মহিলাকে দেখতে পান। সেই বৃদ্ধা তাকে ডাকতে থাকলে হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বলেন, আপনি সামনে চলুন, তার দিকে লক্ষ্য করবেন না। কিছু দূর অগ্রসর হলে আরেক বৃদ্ধ লোক তাকে আহ্বান জানায়। এবারও জিবরাঈল আ. একই নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে হজরত জিবরাঈল আ. ব্যাখ্যা করেন, ১.প্রথম বৃদ্ধা ছিল দুনিয়ার প্রতীক ২.দ্বিতীয় বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিল শয়তানের প্রতীক দুনিয়া ও শয়তান উভয়ই রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আল্লাহর রসুল সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হন। এ ঘটনা উম্মতের জন্য এক সুস্পষ্ট শিক্ষা দুনিয়া ও শয়তানের ডাক উপেক্ষা করাই মুক্তির পথ। আরও পড়ুন: কম্বল-তোশক নাপাক হলে পবিত্র করার উপায় পূর্ববর্তী নবীদের সালাম এরপর রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক জামাআতের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন, যারা বলছিলেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া আউয়াল, আসসালামু আলাইকা ইয়া আখির, আসসালামু আলাইকা ইয়া হাশির।হজরত জিবরাঈল আ. রসুলুকে তাদের সালামের জবাব দিতে বলেন। পরে জানান, এরা ছিলেন হজরত মুসা ও হজরত ঈসা আলাইহিমাস সালাম। ইবনে জারির ও বায়হাকি হজরত আনাস রা. থেকে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। (খাসায়িসু কুবরা:১/১৫৫; তাফসিরু ইবনু কাসির:৬/৮) মিরাজে নবী ও গায়েবি সত্তাদের দর্শন মুসলিম শরিফের বর্ণনায় এসেছে, হজরত আনাস রা. বলেন, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাত্রিতে হজরত মুসা আ.-কে তার কবরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখেছেন। অন্য বর্ণনায় হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي مُوسَى رَجُلًا آدَمَ طُوَالًا، كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ، وَرَأَيْتُ عِيسَى رَجُلًا مَرْبُوعًا، إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ، سَبْطَ الرَّأْسِ، وَرَأَيْتُ الدَّجَّالَ فِي آيَاتٍ أُرِيتُهَا، أَقْرَبُهُمْ شَبَهًا بِهِ ابْنُ قَطَنٍ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজে হজরত মুসা আ. দাজ্জাল এবং জাহান্নামের প্রহরী ফেরেশতা মালিককে দেখেছেন।সহিহ মুসলিম:১৬৪: (খাসায়েসে(খাসায়িসু কুবরা:১/১৬০) গুনাহগারদের ভয়াবহ পরিণতি মিরাজের পথে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন শ্রেণির গুনাহগারদের শাস্তির দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন, পরনিন্দাকারীদের শাস্তি। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ، يَخْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ যখন আমাকে ঊর্ধ্বাকাশে উঠানো হলো (মিরাজে), তখন আমি এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে গেলাম,যাদের নখ ছিল তামার তৈরি। তারা সেই নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হলো সেই লোকেরা, যারা মানুষের গোশত খেত (অর্থাৎ পরনিন্দা করত) এবং মানুষের সম্মান-ইজ্জত নিয়ে আঘাত হানত। (সুনানু আবি দাউদ:৪৮৭৮) সুদখোরের পরিণতিএক ব্যক্তিকে নদীতে সাঁতার কাটতে দেখা যায়, আর তীরে উঠে পাথর খেতে হচ্ছে। জিবরাঈল আ. বলেন, এ ব্যক্তি সুদখোর। (ইবনু মারদুয়াহ) (সিরাতু মুস্তফা:১/৩২৮) নেক আমলের পুরস্কার ও অবহেলার শাস্তি, জিহাদকারীর মর্যাদা এক ব্যক্তি বীজ বপন করছে, সঙ্গে সঙ্গে ফসল উৎপন্ন হয়ে পেকে যাচ্ছে এবং কাটার পর আবার নতুন ফসল জন্ম নিচ্ছে।জিবরাঈল আ. জানান, এটি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর দৃষ্টান্ত, যাদের একটি নেকী সাতশত গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়।নামাজে অবহেলাকারী আরেকদল লোকের মাথা পাথর দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হচ্ছে, আবার তা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসছে। এরা হচ্ছে ফরজ নামাজে অলসতা ও অবহেলা করা লোক।(সিরাতু মুস্তফা:১/৩২৮ জাকাত, ব্যভিচার ও সামাজিক অপরাধের চিত্র জাকাত না দেওয়া ধনীদের দেখা গেল নগ্ন অবস্থায় মাঠে ঘুরছে এবং জাহান্নামের ফল খাচ্ছে। ব্যভিচারীদের সামনে হালাল রান্না করা গোশত থাকলেও তারা দুর্গন্ধযুক্ত কাঁচা গোশত খাচ্ছে।ডাকাতদের উদাহরণ হিসেবে চৌরাস্তার এক টুকরা কাঠ দেখানো হয়, যা পথচারীদের সর্বনাশ করে (সিরাতু মুস্তফা:১/৩২৯)। দায়িত্বলোভী ও দ্বিমুখী বক্তাদের ভয়াবহ পরিণতি একদল মানুষকে দেখা গেল, তারা ক্রমাগত বোঝা বাড়াচ্ছে অথচ তা বহন করার শক্তি নেই। জিবরাঈল আ. বলেন, এরা হচ্ছে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহী লোক। আরেকদল লোকের জিহবা ও ঠোঁট লোহার কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে, বারবার তা আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। এরা হচ্ছে ওয়ায়েজ ও বক্তা, যারা মানুষকে উপদেশ দেয় কিন্তু নিজেরা সে অনুযায়ী আমল করে না। (খাসায়িসুল কুবরা: ১/১৭২) জান্নাত ও জাহান্নামের স্পর্শ শেষ পর্যায়ে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক স্থানে মৃদু শীতল ও সুগন্ধযুক্ত বাতাস অনুভব করেন। জিবরাঈল আ. বলেন, এ হচ্ছে জান্নাতের বাতাস। এরপর দুর্গন্ধপূর্ণ স্থান অতিক্রম করলে জানানো হয়, এ হচ্ছে জাহান্নামের দুর্গন্ধ। (সিরাতু মুস্তফা:১/৩২৯)। এসব ঘটনাই মসজিদে আকসায় পৌঁছানোর পূর্বে, অর্থাৎ ঊর্ধ্বজগতে আরোহণের আগেই সংঘটিত হয়েছিল। মিরাজের এই নিদর্শনগুলো শুধু ঘটনা নয়, বরং প্রতিটি দৃশ্য উম্মতের জন্য সতর্কতা, শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির এক জীবন্ত বার্তা।