জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) আবারও শুরু হচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার মামলার শুনানি।আগামী সোমবার (১২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া দুই সপ্তাহব্যাপী এই শুনানিতে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নিজ জন্মভূমিতে সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে ফিরে যাওয়ার আশায় তাকিয়ে আছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের প্রত্যাশা-পূর্ণ নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।কক্সবাজারের উখিয়ার ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকানে বসে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ গেঁথে রেখেছেন কয়েকজন রোহিঙ্গা। মোবাইলে ভেসে উঠছে একটি খবর- মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদালতে।উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৩ এর বি-৩৯ ব্লকের রোহিঙ্গা তরুণ এনায়েত উল্লাহ (২২) বলেন, ২০১৭ সালে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে-যা বিশ্ববাসী জানে। ইউটিউব, গুগল, ফেসবুকসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। মিয়ানমার সরকার ও বৌদ্ধদের যৌথভাবে চালানো এই নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার গাম্বিয়ার করা মামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আদালতে তিনি প্রত্যাশা করেন এবং ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে বলে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।আরও পড়ুন: বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিজিপি সদস্যদেরকে নজরদারিতে রাখার পরামর্শ বিশ্লেষকদেরশুধু এনায়েত উল্লাহ নন, উখিয়া ও টেকনাফের প্রতিটি আশ্রয় শিবিরেই রোহিঙ্গাদের দৃষ্টি এখন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আইসিজে’র দিকে। যুবক, ইমাম, শিক্ষক, কমিউনিটি নেতা কিংবা নারী; সবারই কৌতূহল একটাই-গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে কী হবে?এ বিষয়ে উখিয়ার ক্যাম্প-৩ এর এ-১০ ব্লকের রোহিঙ্গা ফরিদ উল্লাহ (৫৯) বলেন, ‘১২ জানুয়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানি হবে। গাম্বিয়ার করা মামলায় গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ বিচার হবে বলে তিনি আশাবাদী। ন্যায়বিচার ও ইনসাফ পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান।’ক্যাম্প-৪ এর রোহিঙ্গা মোহাম্মদ করিম (২৬) বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে এবং গাম্বিয়ার মামলায় রোহিঙ্গাদের আইনজীবীদের কাছেও সব প্রমাণ আছে, যা আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করা হবে।’আরও পড়ুন: ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার অগ্রগতি হয়েছে’তিনি আশা করেন, এসব প্রমাণের ভিত্তিতে রায় রোহিঙ্গাদের পক্ষে যাবে এবং ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ই এখন রোহিঙ্গাদের একমাত্র আশা।ক্যাম্প-১ এর ডি-৮ এলাকার মসজিদের ইমাম ছলিম উল্লাহ (৪৬) বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যার দায়ীদের ফাঁসি ও দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি চান তিনি। অপরাধীদের শাস্তি হলে অধিকার, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান বলে জানান তিনি।এ দিকে জাতিসংঘভুক্ত সর্বোচ্চ এই আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১২ জানুয়ারি থেকে এই ঐতিহাসিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই হবে আইসিজে’তে গুণাগুণ বিচারে শোনা প্রথম গণহত্যা মামলা। গাম্বিয়ার দায়ের করা এই মামলার শুনানি চলবে দুই সপ্তাহ ধরে। প্রথম সপ্তাহে (১২-১৫ জানুয়ারি) মামলার বাদী পক্ষ পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম প্রধান দেশ গাম্বিয়া তাদের যুক্তি ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করবে।দ্বিতীয় সপ্তাহে (১৬-২০ জানুয়ারি) মিয়ানমার তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পাবে। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দি শোনার জন্য তিন দিন বরাদ্দ করেছে। তবে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার স্বার্থে এই অংশটি সাধারণ জনগণ ও সংবাদমাধ্যমের জন্য বন্ধ থাকবে।আরও পড়ুন: আইসিসিতে মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের বর্বরোচিত অভিযানে রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে ওআইসির সমর্থনে মামলাটি করে গাম্বিয়া।২০১৭ সালের অভিযানে প্রায় ৭ লাখ ৪২ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারের টেকনাফে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছে।গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাওদা জ্যালো আশা করছেন, জানুয়ারির শুনানির পর আদালত দ্রুত একটি চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবে।তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার কেন রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য দায়ী এবং কেন তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, গাম্বিয়া তা জোরালোভাবে প্রমাণ করবে।’আরও পড়ুন: গণহত্যার বিচার দাবি রোহিঙ্গাদের, সসম্মানে নিজ দেশে ফেরার আকুতিএ দিকে রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতারা বলছেন-গণহত্যায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে আর কোনো রাষ্ট্র এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না।আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের (৫৬) বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানির খবর শুনে তিনি আনন্দিত হলেও বড় শক্তিগুলোর নীরবতায় উদ্বিগ্ন। তিনি আশা করেন, আদালতের রায়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং মিয়ানমারের জান্তা ও বৌদ্ধদের ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিপূরণ মিলবে।’দ্রুত চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন বাংলাদেশে থাকা সম্ভব নয়—এতে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সংস্কৃতি হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বিশ্ববাসীকে গাম্বিয়ার মামলায় সহযোগিতা করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে স্বদেশ আরাকানে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানান। পাশাপাশি গণহত্যার দায়ীদের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন শাস্তির দাবি করে বলেন, এতে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ রোধে শক্ত বার্তা যাবে।আরও পড়ুন: ভোটের আগে ও পরের কয়েকদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প সিল রাখতে হবেআর আন্তর্জাতিক আদালতের সম্ভাব্য ইতিবাচক রায় মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পক্ষে গাম্বিয়ার করা মামলাটি এখন চূড়ান্ত শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এই শুনানি চলতে পারে।’তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালত গাম্বিয়ার আবেদন গ্রহণ করে রোহিঙ্গাদের পক্ষে ইতিবাচক রায় দেবে। এতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’