রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, ইউক্রেনে ইউরোপীয় বা ন্যাটো সেনাদের উপস্থিতি সহ্য করবে না রাশিয়া। ইউরোপীয় নেতারা ইউরোপে সর্বাত্মক যুদ্ধ চান বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। খবর আনাদোলু এজেন্সির।ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে ইউরোপীয় নেতাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিক্রিয়ায় এই হুঁশিয়ারি দেন মেদভেদেভ। শনিবার (১০ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় শাসকগোষ্ঠীর বোকা নেতারা ইউরোপে যুদ্ধ চায়। হাজারবার বলা হয়েছে: রাশিয়া ইউক্রেনে কোনো ইউরোপীয় বা ন্যাটো সেনা মানবে না। কিন্তু না, ম্যাক্রোঁ (ফরাসি প্রেসিড্টে) এই বাজে কথা অব্যাহত রেখেছেন।’ পোস্টে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পশ্চিম ইউক্রেনে হামলার ফুটেজ সংযুক্ত করে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা, তাহলে আসুন। আপনি এভাবেই তার জবাব পাবেন।’ ইউক্রেনে গত প্রায় চার বছর ধরে চলমান সংঘাতের অবসানে আলোচনার মধ্যে গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ফ্রান্সে তথাকথিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’র অন্তর্ভুক্ত ইউরোপের ৩৫টি দেশের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে যুদ্ধবিরতি ও এর পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন প্রতিনিধিরা। আরও পড়ুন: ইউক্রেনকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলো যুক্তরাষ্ট্র, সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যের এ সময় ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সেনা পাঠানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে সামরিক ঘাঁটি করে তোলার সিদ্ধান্ত জানায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এরপর এ বিষয়ক একটি চুক্তিতে সাক্ষর করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রো, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। মস্কো শুরু থেকেই বলে আসছে, ইউক্রেনে যেকোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতিকে সরাসরি হুমকি এবং বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। হামলা পাল্টা হামলা অব্যাহত এদিকে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি এলাকায় রাশিয়ার বোমা হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। অন্যদিকে ইউক্রেনের পাল্টা হামলায় দুই রুশ নাগরিক আহত হয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে। ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা বিভাগের তথ্য মতে, শনিবার (১০ জানুয়ারি) রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দেনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে বোমাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা চালায়, যার ফলে ৬৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তি নিহত, আরও তিনজন আহত এবং একাধিক আবাসিক ভবনে আগুন লাগে। জরুরি পরিষেবা বিভাগ আরও জানায়, ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্ক জেলায় রাশিয়ার গোলাবর্ষণে আরও একজন নিহত হন। এছাড়া দোনেৎস্কের ইয়ারোভা, কোস্টিয়াননিভকা এবং স্লোভিয়ানস্ক এলাকায় রাশিয়ার হামলায় আরও তিনজন ইউক্রেনীয় নিহত এবং নয়জন আহত হন। আরও পড়ুন: ‘বিশ্ব ব্যবস্থা ধ্বংস করছে যুক্তরাষ্ট্র’, ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা জার্মান প্রেসিডেন্টের ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ শনিবার ১৩৯টি যুদ্ধ সংঘর্ষের কথা জানায়। বলা হয়, রাশিয়া ৩৩টি বিমান হামলা চালিয়েছে। ৪ হাজার ৪৩০টিরও বেশি ড্রোন ছুড়েছে এবং ইউক্রেনীয় সেনা ও বসতিতে ২ হাজার ৮৩০টি আক্রমণ চালিয়েছে। ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ সাইট ডিপস্টেট অনুসারে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের মার্কোভ এবং ক্লেবান-বাইক গ্রামের দিকে আরও অগ্রসর হয়েছে। তবে অন্য কোনো বড় পরিবর্তনের খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলে হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করল মস্কো। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাশিয়ার সামরিক বাহিনী জানায়, ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা ও ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র লক্ষ্য করে রাতভর চালানো ব্যাপক হামলার অংশ হিসেবেই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি বাসভবনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলার চেষ্টার জবাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সেদিন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন। এছাড়া হাজার হাজার অ্যাপার্টমেন্ট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শহরের সামরিক প্রশাসনের প্রধান টাইমুর তাকাচেঙ্কো শনিবার জানান, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য দেশটির ইঞ্জিনিয়াররা ‘চব্বিশ ঘন্টা’ কাজ করছেন। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিটসকো বলেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন প্রায় অর্ধেক বাড়িতে তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। এদিকে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার ভোরোনেজে শহরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন। এর আগে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সীমান্তবর্তী রাশিয়ার বেলগোরোড অঞ্চলের ৬ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। তাপ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। আরও পড়ুন: পুতিনের ‘জবাব’, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল রাশিয়া! ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ভলগোগ্রাদ অঞ্চলেও একটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ওকটিয়াব্রস্কি জেলার একটি তেল ডিপোতে আগুন লাগে বলে জানায় আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ। রুশ কর্তৃপক্ষ বলছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণহানির খবর নেই। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে।