ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোলা-১ (সদর) আসনের নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এবারের নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৭ প্রার্থীর মধ্যে ৩ জনই কোটিপতি এবং ৩ জন লাখোপতি। তবে এই ভিড়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বার্ষিক আয়ের একজন প্রার্থীও লড়াই করছেন। প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সাত বছরের ব্যবধানে হেভিওয়েট দুই প্রার্থী বিএনপি ও বিজেপি নেতার আয় ও সম্পদ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থীর সংগ্রহে রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার।বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর হলফনামা অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের ব্যবধানে তার আয় ও সম্পদ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বর্তমানে তার বার্ষিক আয় ৪১ লাখ ৪১ হাজার ৪৫২ টাকা, যার বড় অংশই আসে আইন পেশা ও শিক্ষকতা (৩৩ লাখ ৮৯ হাজার ৩৪৫ টাকা) এবং ব্যবসা (৭ লাখ ৫২ হাজার ১০৭ টাকা) থেকে। ২০১৮ সালে তার আয় ছিল ২১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭০ টাকা। বর্তমানে তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ২২ লাখ ৩৩ হাজার ১২ টাকা, যার মধ্যে নগদ ৭৬ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯ টাকা এবং ব্যাংকে ৭২ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৮ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া তার ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি এবং ১০০ তোলা স্বর্ণ রয়েছে। তার স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকায় যৌথ মালিকানায় একটি তিনতলা দালান ও একটি বাড়ি থাকলেও সেগুলোর দাম উল্লেখ করা হয়নি। গত নির্বাচনে ব্রিটিশ স্কুল অব ল-এর শিক্ষকদের বেতন বাবদ তার ১০ লাখ ৪২ হাজার ২৫৬ টাকার দায় থাকলেও এবার তিনি নির্বাচনী ব্যয় বাবদ ২৪ লাখ টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবেন বলে জানিয়েছেন।বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীরের সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র আরও চমকপ্রদ। সাত বছরে তার আয় বেড়েছে ৫২ লাখ ১৬ হাজার ৭২২ টাকা এবং মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৭ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৭৭ টাকার। বর্তমানে তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ৬৪ হাজার ৪৫ টাকা। তার ৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকায় অর্জনকালীন ২ কোটি টাকা মূল্যের ৬টি ফ্ল্যাট, ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের নির্মাণাধীন ভবন এবং ৩ কোটি টাকা মূল্যের দুটি লঞ্চ রয়েছে। যদিও লঞ্চের বিপরীতে তার একক ও যৌথ মিলিয়ে ৯ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে, তবে তিনি ঋণ খেলাপি নন। ২০১৮ সালে তার স্থাবর সম্পদ ছিল ২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এবারের নির্বাচনে ২৫ লাখ টাকা তিনি নিজস্ব ব্যবসা থেকে ব্যয় করবেন। তার বিরুদ্ধে থাকা ৪টি মামলা থেকে তিনি ইতোমধ্যে অব্যাহতি পেয়েছেন।আয়ের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও কোটিপতি তালিকায় নাম লিখিয়েছেন ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আশ্রাফ আলী। পেশায় শিক্ষক এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় ১৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ ও ব্যাংক জমা রয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা। তার স্থাবর সম্পত্তিতে ৮০ শতাংশ কৃষি ও ১৮০ শতাংশ অকৃষি জমি থাকলেও এর মূল্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। তিনি নির্বাচনে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।আরও পড়ুন: ২০০৮ সালের নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনার সম্পদের তথ্য মিথ্যা: দুদকজামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম একজন লাখোপতি প্রার্থী হলেও তার স্ত্রীর স্বর্ণের পরিমাণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নজরুল ইসলামের বার্ষিক আয় ১২ লাখ ২২ হাজার ৮৮৯ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ৩৮২ টাকা। তবে তিনি উপহার হিসেবে পাওয়া ১৫০ ভরি স্বর্ণের কথা উল্লেখ করেছেন, যার কোনো বাজারমূল্য দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি নির্বাচনে ১৮ লাখ টাকা ব্যয় করবেন, যার বড় অংশ আসবে পিতা ও বোনের অনুদান এবং ঋণ থেকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. ওবায়দুর রহমানও একজন লাখোপতি। তার বার্ষিক আয় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ২৯ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬ টাকা। তার ১৮ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি ও ২০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। তিনি নিজস্ব তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী আইনুর রহমান জুয়েল মিয়া ৪ লাখ টাকা বার্ষিক আয় নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। তার ৩ একর অকৃষি জমি এবং ৭ ভরি সোনা রয়েছে। তিনি তার নির্বাচনী ব্যয় ৪ লাখ টাকা নিজের ব্যবসা থেকে মেটাবেন।অন্যদিকে, এই আসনের সবচেয়ে আলোচিত ও স্বল্প আয়ের প্রার্থী হলেন এনপিপির মো. মিজানুর রহমান। তার বার্ষিক আয় মাত্র ১০ হাজার টাকা, যা আসে টিউশনি থেকে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি কাঁচাঘরই তার একমাত্র স্থাবর সম্পদ। তিনি নির্বাচনে মাত্র ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন, যা সংগৃহীত হবে টিউশনি ও স্বজনদের সহায়তায়।প্রার্থীদের স্ত্রীদের সম্পদের তথ্যে দেখা যায়, ব্যারিস্টার পার্থের স্ত্রী শেখ সায়রা শারমিনের ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদ ও ৬০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। বিএনপি প্রার্থীর স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আফিফা মুস্তারি ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৭৩৩ টাকার মালিক। জামায়াত প্রার্থীর স্ত্রী লায়লা আনজুমান্দ বানু বার্ষিক ৫ লাখ ৬২ হাজার ৮৯৬ টাকা আয় করেন। তবে ইসলামী আন্দোলন, ইসলামিক ফ্রন্ট ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীদের স্ত্রীদের আয় বা সম্পদের কোনো তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি এবং এনপিপি প্রার্থীর স্ত্রী নেই বলে জানানো হয়েছে।