বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন একটি মাসের ঘটনাপ্রবাহ শুধু সংবাদপত্রের শিরোনামে আটকে থাকে না; বরং সেই সময় জনগণের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ শাসন ব্যবস্থার প্রবণতাকে নতুনভাবে নির্ধারণ করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ঠিক এমনই এক সময়। বছরের শেষ মাসটি যেন নতুন বছরের রাজনীতির জন্য একটি সূচনাবিন্দু হয়ে উঠেছে। যেখানে একদিকে ভয়াবহ সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার সংকট জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে মানুষের প্রত্যাশাও নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে। এই মাসে দেশের রাজনীতি যেন একসঙ্গে দুই বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে; একটি হলো শঙ্কা ও অস্থিরতা, অন্যটি আশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এই দ্বৈত বাস্তবতাই হলো রূপান্তরকালীন রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ট্রানজিশনাল পলিটিকস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ডিসেম্বরের এই রাজনৈতিক অভিঘাতের সূচনা হয় একটি ঘটনা দিয়ে, যা কেবল একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, বরং গোটা সমাজের নিরাপত্তাবোধকে নাড়া দেয়। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা–৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর মারা যান হাদি। এই হত্যাকাণ্ডের তাৎপর্য শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু নয়; বরং এটি দেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশে সহিংসতার পুনঃপ্রবেশ এবং নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকির বাস্তব প্রমাণ। যখন একটি নির্বাচন সামনে থাকে, তখন এমন ঘটনা ভোটারকে কেবল ভয় দেখায় না, এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে; রাষ্ট্র কি নাগরিককে সুরক্ষা দিতে পারছে? নির্বাচন কমিশন কি নিরাপদ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে? প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর যত অনিশ্চিত হয়, গণতন্ত্রের ভিত্তি তত দুর্বল হয়ে পড়ে। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়, তা ছিল শহুরে বাংলাদেশের বাস্তব মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন। উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতিতে ভোটারদের চাহিদা ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন। প্রান্তিক এলাকাগুলোতে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, খাদ্য ও মৌলিক সেবা। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো নিরাপত্তা; কারণ শহরের জীবনযাত্রা প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণ ও চাপপূর্ণ; সেখানে অপরাধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা খুব দ্রুত সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে। এই কারণেই শহুরে ভোটারের রাজনৈতিক আচরণ অনেক সময় আবেগ নয়, বরং নিরাপত্তাবোধ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ফলে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে হামলা নয়, এটি শহুরে ভোটারের আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। তবে একই সঙ্গে এ ঘটনার একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের বিপুল উপস্থিতি যেন নীরবে ঘোষণা করেছে, দেশের মানুষ সন্ত্রাসী রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত। জনতার এই উপস্থিতি ছিল এক ধরনের সামাজিক জবাবদিহিতা; জনগণ যেন বলেছে, তারা নিরাপদ রাজনীতি চায়, তারা সৎ ও গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি চায়, তারা ভয়ভীতির রাজনীতি মেনে নেবে না। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান বলে, যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আস্থা কমে যায়, তখন জনগণ অনেক সময় ঐক্যবদ্ধ হয় প্রতীকী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওসমান হাদির জানাজা তেমনই একটি প্রতীকী মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল; যা দেখিয়েছে, মানুষের মধ্যে আবেগ আছে, কিন্তু সেই আবেগ এখন মূলত নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র রক্ষার আবেগ। এই অস্থিরতার মধ্যেই আসে আরেকটি বড় দুঃসংবাদ, দেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শেষে তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একদিকে গভীর আবেগ তৈরি করে, অন্যদিকে দল-মত নির্বিশেষে জনমনে শোক ও শ্রদ্ধার এক বিরল ঐক্য এনে দেয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক ঘোষণা করা হয়, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা ও দাফনের আয়োজন হয়, এবং তার জানাজায় আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকের মতে, খালেদা জিয়ার জানাজা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব জনসমাগমের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকার রাজপথে সেদিন মানুষের ঢল নেমেছিল, তা শুধু দলীয় নেতা-কর্মী নন; সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী, নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ সবাই শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। এই জনস্রোত কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি ছিল ক্ষমতার বাইরে থেকেও একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতি জনগণের গভীর আস্থা ও মর্যাদার এক নীরব স্বীকৃতি। খালেদা জিয়া বিএনপির কাছে দীর্ঘদিন ধরে ‘ঐক্যের প্রতীক’ ছিলেন; তার মৃত্যুর পরও সেই প্রতীকী শক্তি বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে এক ধরনের আবেগী সংহতি ও নতুন গতিশীলতা দিয়েছে। রাজনীতির বাস্তবতা হলো কিছু ঘটনা ক্ষমতার হিসাব বদলানোর আগেই জনমনের মানচিত্র বদলে দেয়; দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তেমনই একটি সময় হয়ে উঠেছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড- এই দুটি ঘটনা যদি একই মাসের ভেতরে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ডিসেম্বর ২০২৫-কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ধরনের ‘মোড় ঘোরানো মাস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। একদিকে এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নগ্নভাবে সামনে এনেছে, অন্যদিকে এটি জনগণের ভেতরকার রাজনৈতিক আবেগ ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা দৃশ্যমান করেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা দেশের রাজনীতিকে এমন এক সন্ধিক্ষণে নিয়ে এসেছে, যেখানে পরিবর্তন আর কেবল স্লোগান নয়, পরিবর্তনকে প্রতিষ্ঠান, নীতি এবং সংস্কারের ভাষায় রূপ দিতে হবে। যে রাজনৈতিক শক্তি এই আবেগ দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতিতে রূপান্তর করতে পারবে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণে নেতৃত্বও তার হাতেই যাবে। এই আবহের মধ্যেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৭ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। তার দেশে ফেরা নিছক একটি দলীয় ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে একটি বড় প্রতীকী ও কৌশলগত পরিবর্তন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিএনপি ছিল এমন এক দলের মতো, যার মাঠ আছে কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ‘দূরে’; সাংগঠনিক কাঠামো আছে কিন্তু রাজনৈতিক গতি অনেকটা প্রতীক্ষার মধ্যে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির ভেতরে শুধু আবেগ নয় সাংগঠনিক আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে এটি ভোটারদের সামনে একটি বাস্তব চিত্র তৈরি করেছে: বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে নেই; বিএনপি এখন নির্বাচনের জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ নিয়ে এগোতে প্রস্তুত। তারেক রহমান দেশে ফেরার পর তার চারপাশে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল সেটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বাভাবিক। কারণ সাম্প্রতিক সহিংসতা, বিশেষ করে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর বড় রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু বড় প্রশ্ন ছিল, এই নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেও তিনি কি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারবেন? শেষ পর্যন্ত তার কর্মসূচির প্রকৃতি ও জনসম্পৃক্ততার কারণে বোঝা গেছে, তিনি শুধু ‘উপস্থিত’ হননি; তিনি জনমত গঠনের সক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি মূল পরীক্ষা হলো আবেগকে উত্তেজনায় রূপ দেওয়া নয়, বরং আবেগকে সামলে নীতি ও পরিকল্পনায় নেওয়া। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সাক্ষাতের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো লোকজন তাকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে বের হয়ে বলছে, তিনি দেশ নিয়ে পরিকল্পনা কথা বলেন। এই ‘পলিসি-সেন্ট্রিক’ রাজনৈতিক ভাষ্য বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়, কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলের পর এটি আবার দৃশ্যমান হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এর আরেকটি বড় ঘটনা নির্বাচনি রাজনীতির আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন। নির্বাচন কমিশন গত ১১ ডিসেম্বর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে একটি জাতীয় গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত। এই তফসিল ঘোষণার পর নির্বাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা একটি বাস্তব রূপ নেয়। মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই, নির্বাচনি প্রচার সবকিছুই ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এমন নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের পথ নয়, এটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের বড় সুযোগ। কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনপর্বের পর একটি নির্বাচিত সরকারের বৈধতা রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন শক্তি যোগ করে। কিন্তু এখানেই আসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল বিষয়টি: মানুষ কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন চায় না; মানুষ চায় রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার। এটি এখন জনগণের সবচেয়ে গভীর উপলব্ধি। জনগণ বুঝতে শুরু করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হলে গণতন্ত্র শুধু প্রতীক হয়ে থাকে। নিরাপত্তা সংকট, সহিংসতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ঘাটতি, এসবের সমাধান কেবল একজন নেতা বদলে নয়; এটি সম্ভব কেবল কাঠামোগত সংস্কার দিয়ে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ বাস্তবতায় জনগণ তারেক রহমানের কাছে কী চায়? জনগণের আশা বর্তমানে তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথমত, তারা চায় একটি নিরাপদ নির্বাচন, যেখানে তারা ভয়ভীতির বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা চায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিশেষ করে মব কালচার, অপরাধ, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে শক্ত পদক্ষেপ। তৃতীয়ত, তারা চায় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কারণ অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির চিত্র বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ব্যাংকখাতে ঋণখেলাপির লাগামহীন বিস্তার, শেয়ারবাজারের অস্থিরতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বেকারত্বের চাপ, এসবই রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। যখন বিনিয়োগ কমে যায়, নতুন চাকরি তৈরি হয় না, তখন তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা বাড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। মব কালচারও অনেক সময় এই হতাশার সামাজিক প্রতিফলন। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এ সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। ফলে একটি নির্বাচিত সরকার দরকার, যার রাজনৈতিক বৈধতা থাকবে এবং যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার করতে পারবেন। এটাই জনগণের বড় আশা। ব্যবসায়ীদের চাহিদাও প্রায় একই জায়গায় কেন্দ্রীভূত। তারা প্রথমত চায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্বিতীয়ত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং তৃতীয়ত ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা। কারণ অস্থিরতার মধ্যে ব্যবসা বড় ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থনীতিতে আস্থা তৈরি না হলে শিল্প ও রপ্তানি খাত সম্প্রসারিত হয় না। নতুন পণ্যের রপ্তানি বা বাজার তৈরি হয় না, যা বাংলাদেশকে সম্ভাবনার দেশ থেকেও ‘অপ্রয়োগিক সম্ভাবনা’র দেশে পরিণত করতে পারে। এই জায়গায় রাষ্ট্রকে বড় পরিকল্পনা নিতে হয়, শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব নীতিগত রোডম্যাপ দরকার। তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি কোনো স্বপ্নের মধ্যে নেই; আমরা আছি পরিকল্পনার মধ্যে। আমরা পরিকল্পনা করবো, আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো।’ তিনি বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও আলোচনা সভায় একাধিকবার ৮টি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেন, যা সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনাগুলোর একটি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। একাধিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী তারেক রহমান বলেছেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে দেশের সব নারীকে ইউনিভার্সাল ফ্যামিলি কার্ড স্কিমের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার লক্ষ্য চার কোটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা। আরেকটি বহুল আলোচিত প্রস্তাব হলো ‘কৃষক কার্ড’। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষি ভর্তূকি, সার-বীজ সহায়তা এবং কৃষিঋণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা সম্ভব, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, প্রতিটি জেলার ঐতিহ্যভিত্তিক শিল্প ও পণ্য উন্নয়নে স্বল্পসুদে ঋণ এবং এসএমই খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির অঙ্গীকারও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এ ধরনের উদ্যোগ যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর সুযোগ। উন্নয়ন অর্থনীতিতে টার্গেটেড সেফটি নেট বা লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা খুব কার্যকর হতে পারে, যদি সেটি ডিজিটাল সিস্টেম, স্বচ্ছ বাছাই প্রক্রিয়া এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধর্মীয় সমাজের চাহিদা বিবেচনায় তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিএনপি ক্ষমতায় এলে ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের জন্য স্থায়ী সম্মানি ভাতা চালুর সম্ভাবনার কথা আলোচনায় আছে। এ ধরনের উদ্যোগকে যদি ‘ভাতা’ হিসেবে নয়, বরং কমিউনিটি সার্ভিস অ্যালাউন্স হিসেবে কাঠামোগতভাবে ডিজাইন করা যায়, যেখানে মসজিদভিত্তিক সামাজিক সেবা, নৈতিক শিক্ষা, যুব উন্নয়ন, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, পারিবারিক পরামর্শ ইত্যাদি কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে এটি সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এজন্য রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা এটি অনিয়ম ও রাজনৈতিক বিতর্কের উৎস হতে পারে। তারেক রহমানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা হলো, তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে নতুন শিল্পে রূপান্তর করা এবং ফ্রিল্যান্সার/প্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করা। তিনি পেপালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর কথা বলেন, যাতে বৈশ্বিক অর্থ লেনদেন, ডিজিটাল কেনাকাটা এবং ব্যাংকিং পেমেন্ট ব্যবস্থা সহজ হয়। এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে পারলে এটি ফ্রিল্যান্সিং খাতের বৈধ আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সপ্রবাহ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তারেক রহমান কর্মসংস্থানকে কেন্দ্রীয় এজেন্ডা হিসেবে সামনে এনেছেন। তিনি পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলেছেন; বিশেষ করে আইটি সেক্টরে নতুন শিল্প (সাইবার নিরাপত্তা, আউটসোর্সিং, সেমিকন্ডাক্টর, ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি) গড়ে তুলে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে উদ্যোগ এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যের কথাও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। কর্মসংস্থান শুধু যুব সমাজের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতির ভিত্তি। বিএনপির ‘আইটি প্রশিক্ষণ, বিদেশে কর্মসংস্থান, স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ উদ্যোগগুলোর সঙ্গে একটি বাস্তব ‘জব ক্রিয়েশন ফ্রেমওয়ার্ক’ যুক্ত করা দরকার, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও চাকরির বাজার একসঙ্গে কাজ করে। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই চাকরি হয় না, চাকরি হয় যখন অর্থনীতিতে নতুন শিল্প ও নতুন বিনিয়োগ আসে। তাই বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনা একসঙ্গে আনতে হবে। এখন আসল প্রশ্ন হলো এ পরিকল্পনাগুলো জনগণের আস্থা ফেরাতে সহায়ক হলেও রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে হলে আরও কিছু বড় পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ করে অর্থনীতি ও ব্যাংকখাতে। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সংকট। ব্যাংকখাতে বিএনপি কী করবে? এ বিষয়ে স্পষ্ট নীতি ঘোষণা প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণকে শুধু কথায় না রেখে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দ, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা বোর্ড গঠন করা ছাড়া ব্যাংকখাত স্বাভাবিক হবে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে; কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালী না হলে আর্থিক খাত কখনো শৃঙ্খলায় আসবে না। বিএনপির উচিত হবে একটি “Banking Sector Governance Reform Plan” ঘোষণা করা; যেখানে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য, ব্যাংকের ক্যাপিটাল ঘাটতি পূরণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের সময়সূচি থাকবে। সংস্কার প্রয়োজন দেশের শেয়ারবাজারেও। কারণ শেয়ারবাজার শক্তিশালী না হলে শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস তৈরি হবে না। শেয়ারবাজারকে যদি আবারও ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর ক্ষতির জায়গা’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে জনগণের সঞ্চয় উৎপাদন খাতে না গিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাবে। সবচেয়ে বড় ও কাঠামোগত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে বিএনপির ‘৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি’। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমান এই কর্মসূচিকে প্রতিশোধের রাজনীতি নয় বরং সংস্কারের রাজনীতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং নির্বাচিত হলে দ্রুত এর বাস্তবায়নের কথাও বলেন। এই কর্মসূচির গুরুত্ব এখানেই যে, এটি বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানকে একটি নীতিকেন্দ্রিক (policy-centric) কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে পারে, যদি এটি কেবল নির্বাচনি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে কার্যকর রূপ পায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিশ্রুতি নতুন নয়, কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রূপান্তর করার সক্ষমতাই একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত মানদণ্ড। সেখানেই ‘৩১ দফা’ বিএনপির জন্য যেমন সম্ভাবনার ক্ষেত্র, তেমনি এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্রও; কারণ জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতির সৌন্দর্য নয়, প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো—এসব পরিকল্পনা আদৌ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর। ব্যাংকখাতে সুশাসন, বিনিয়োগ আস্থা, করনীতি বাস্তবায়ন, শেয়ারবাজারের শৃঙ্খলা সবই প্রতিষ্ঠাননির্ভর। অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাঠামো যদি দুর্বল থাকে, তাহলে সবচেয়ে ভালো নীতিও শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই বিএনপির উচিত হবে নির্বাচনপূর্ব সময় থেকেই স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা—ক্ষমতায় গেলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা দলীয়করণ থেকে মুক্ত করে স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী করবে। কারণ জনগণ আজ সবচেয়ে বেশি চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী এবং নেতৃত্ব আইন ও কাঠামোর ভেতরে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব কোনো একক নেতার জনপ্রিয়তার ওপর নয়; বরং তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে তার ওপর। এই জায়গায় এসে প্রশ্ন ওঠে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক গুরুত্ব কোথায়? বর্তমানে তিনি একটি ‘সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, কারণ তার প্রত্যাবর্তনে বিএনপির ভেতরে সংগঠন পুনর্গঠনের আশা তৈরি হয়েছে এবং নির্বাচন ঘিরে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহও বাড়ছে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে আবেগকে বাস্তব রাষ্ট্রনীতি বানানো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করা। খালেদা জিয়ার শূন্যতায় তাকে নতুন রাজনৈতিক প্রতীক হতে হবে; একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের কাঠামোকে নতুন বাস্তবতায় শক্তিশালীভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ কাজের জন্য নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, স্থানীয় সরকারের শক্ত ভিত্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ—এসব মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। অর্থাৎ নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখা নয়; নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রকে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক স্থিতি দৃশ্যমান হয়। বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে সম্ভাবনার দেশ। শুধু প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন। তারেক রহমান বলছেন তিনি পরিকল্পনার কথা ভাবছেন, দেশের মানুষ মনে করে তিনি হয়তো সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও রাখেন। কিন্তু শেষ কথা হলো—রাজনীতি শুধু নেতা দিয়ে চলে না; রাজনীতি চলে প্রতিষ্ঠান দিয়ে, চলে কাঠামো দিয়ে, চলে জনগণের অংশগ্রহণ দিয়ে। ডিসেম্বর ২০২৫ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। এই সময়কে যদি দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারে, এবং যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সত্যিই সংস্কার ও জবাবদিহিতার পথে পরিচালিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি পরিশীলিত গণতান্ত্রিক চর্চার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আর সেটাই হতে পারে ডিসেম্বর মাসের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক ঐতিহাসিক অর্জন— যেখানে নির্বাচন হবে কেবল ক্ষমতা বদলের উৎসব নয়, বরং হবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি। লেখক:ড. মো: হাছান উদ্দীন অধ্যাপক ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালীhasan14860@pstu.ac.bd এমএফএ/এমএস