চোখের অসুখ নাকি সাধারণ মাথাব্যথা? যা বলেছেন চিকিৎসক

মাথাব্যথা বারবার হলে আমরা বেশিরভাগ সময়ই একে সাধারণ সমস্যা ভেবে ব্যথানাশকেই ভরসা করি। কিন্তু এর পেছনে চোখের কোনো জটিল অসুখ লুকিয়ে আছে কি না, সে প্রশ্নটি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। ঝাপসা দেখা, চোখে চাপ লাগা বা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাজ করার পর মাথাব্যথা এই উপসর্গগুলো চোখের সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা বলছেন, ‘মাথাব্যথাকে সব সময় সাধারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে যদি এর সঙ্গে চোখে অস্বস্তি, ঝাপসা দেখা বা চোখ ক্লান্ত হওয়ার উপসর্গ থাকে তাহলে অবশ্যই চোখ পরীক্ষা করানো জরুরি।’ কোন লক্ষণে সতর্ক হওয়া জরুরি এবং কখন মাথাব্যথার পেছনে চোখের দিকেই নজর দেওয়া উচিত সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা। মাথাব্যথা কেন চোখের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে? আমাদের চোখ ও মস্তিষ্ক একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। চোখের দৃষ্টিসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা হলে মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। এই অতিরিক্ত চাপ থেকেই অনেক সময় মাথাব্যথা শুরু হয়। বিশেষ করে- দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া চোখে পাওয়ারের সমস্যা (মায়োপিয়া, হাইপারমেট্রোপিয়া, অ্যাস্টিগম্যাটিজম) চশমার পাওয়ার ভুল থাকা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা এসব কারণে চোখ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং এর প্রভাব পড়ে মাথায়। ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, অনেক রোগী মাথাব্যথার অভিযোগ নিয়ে আসেন, কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায় তাদের চোখে পাওয়ারের সমস্যা রয়েছে বা দীর্ঘদিন ধরে ভুল পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করছেন। ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথা একসঙ্গে হলে সতর্ক হোন ঝাপসা দেখা অনেকেই সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু যখন ঝাপসা দেখার সঙ্গে মাথাব্যথা যুক্ত হয়, তখন সেটি চোখের সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখ ঠিকমতো ফোকাস করতে না পারলে চোখের পেশিকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এই পরিশ্রমের ফলেই মাথার পেছনে বা কপালের দিকে ব্যথা অনুভূত হয়। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়া বা পড়তে বসলে মাথাব্যথার অভিযোগের পেছনে লুকিয়ে থাকে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা। স্ক্রিন-নির্ভর জীবনে চোখ ও মাথাব্যথা বর্তমান সময়ে মোবাইল, কম্পিউটার ও ট্যাবলেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক কম পড়ে, চোখ শুষ্ক হয়ে যায় এবং চোখের পেশিতে টান পড়ে। এর ফলেই দেখা দেয় চোখের জ্বালা, ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথা। চিকিৎসকেরা একে বলেন ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেইন’। ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা বলেন, ‘স্ক্রিনে কাজ করা একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে নিয়ম মেনে বিরতি না নিলে চোখের সমস্যার সঙ্গে মাথাব্যথাও বাড়তে থাকে।’ কোন কোন চোখের সমস্যায় মাথাব্যথা বেশি হয়? চোখে পাওয়ারের সমস্যা থাকলে চোখের আকৃতি অসমান হলে চোখ শুষ্ক হয়ে গেলে বিশেষ ক্ষেত্রে মাথাব্যথা ও চোখে চাপ অনুভূত হয় বিশেষ করে গ্লুকোমার মতো রোগ প্রাথমিক অবস্থায় খুব বেশি লক্ষণ না দেখালেও মাথাব্যথা ও চোখে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, যা অবহেলা করলে দৃষ্টিশক্তির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। কখন অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন? চিকিৎসকদের মতে, বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, মাথাব্যথার সঙ্গে ঝাপসা দেখা, চোখে চাপ বা ভারী অনুভূতি, পড়তে বা স্ক্রিন দেখতে গেলে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া, আলোতে চোখে অস্বস্তি হলে দেরি না করে চোখ পরীক্ষা করানো জরুরি। ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা পরামর্শ দেন, ‘অনেকে মাথাব্যথার জন্য শুধু নিউরোলজিস্টের কাছে যান। কিন্তু চোখ পরীক্ষা না করালে সমস্যার মূল কারণ ধরা পড়ে না। তাই চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখানো জরুরি।’ আরও পড়ুন:  স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের পানি দ্রুত শুকিয়ে যায় মন ভালো রাখার ছোট ছোট অভ্যাস ওজন কমানো ও রোগ প্রতিরোধের গোপন বন্ধু বাঁধাকপি কীভাবে প্রতিরোধ করবেন? বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করা সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করা স্ক্রিনে কাজ করার সময় ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলা পর্যাপ্ত পানি পান করা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এসব ছোট অভ্যাস চোখকে যেমন সুস্থ রাখে, তেমনি অকারণ মাথাব্যথাও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। মাথাব্যথা মানেই সব সময় সাধারণ সমস্যা নয়। এর পেছনে চোখের কোনো অসুখ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা সময়মতো ধরা না পড়লে জটিল আকার নিতে পারে। তাই বারবার মাথাব্যথা হলে শুধু ব্যথানাশকের ওপর নির্ভর না করে চোখের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। সচেতন হলেই চোখ ও মাথা দুটোই রাখা সম্ভব সুস্থ ও স্বস্তিতে। জেএস/