শীতের কাকডাকা ভোরে অন্যরা যেখানে লেপের নিচে আরাম করে ঘুমাচ্ছেন, সেখানে পাবনার গৃহিণীরা কেউ পাটায় বাটছেন আবার কেউ মেশিনে ডালের পেস্ট বানাতে ব্যস্ত। এরপর এর সঙ্গে পাকা চাল কুমড়া, কালোজিরা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করছেন কুমড়া বড়ি। স্বাদে অনন্য হওয়ায় তরকারিতে রসনা প্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে এ কুমড়া বড়ি। মাছের ঝোল কিংবা সবজির লাবড়া কয়েকটা কুমড়া বড়ি দিলে এর স্বাদ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তরকারি রান্নায় বাড়তি স্বাদের জন্য বাঙালির খাদ্য ঐতিহ্যের অংশ হয়েছে এই বড়ি। বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় দামও মিলছে বেশ। তাই শীতের আমেজের শুরুতেই পাবনার গ্রামগুলোতে ধুম পড়ে কুমড়া বড়ি বানানোর। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বল্প ব্যয় ও পরিশ্রমে বাড়তি আয়ের জন্য অনেকেই বাণিজ্যিকভাবেও বানাচ্ছেন কুমড়া বড়ি। সাহায্য করছেন পুরুষরাও। এভাবেই জেলার গ্রামগুলোতে নিরবে বাড়ছে কুমড়া বড়ি তৈরির। বাড়তি আয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন স্বচ্ছলতা ও স্বাবলম্বী হবার গল্প। বাড়ছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও। তথ্য বলছে, পাবনার ৯ টি উপজেলার গ্রামগুলোতেই কম বেশি কুমড়া বড়ি তৈরি হয়। তবে জেলার চাটমোহর, ফরিদপুর, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলায় বেশি তৈরি হয় এ বড়ি। চাটমোহরের ফৈলজানা, দোলং, রামনগর, মথুরাপুর, বোঁথর, কুমারগাড়া, হান্ডিয়াল ও পৌর এলাকার হাজারের অধিক পরিবার কুমড়া বড়ি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া ফরিদপুরের ডেমরা, ডেমরা মধ্যপাড়া, রতনপুর ও পাথার এলাকা সহ উপজেলার অধিকাংশ গ্রামগুলোতে তৈরি হয় বড়ি। একইভাবে সাঁথিয়া, সুজানগর ও সদর উপজেলার গ্রামগুলোতেও শীতের শুরু থেকেই বড়ি বানানোর ধুম পড়ে যায়। এসব অঞ্চল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীতের পুরো সময় জুড়ে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গৃহবধূরা কুমড়া বড়ি বানানোর কাজ করেন। বাড়ির ছোটবড় সবাই এতে হাত লাগান। আবহাওয়া ভালো থাকলে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিদিনই বড়ি বানান কারিগররা। খুব ভোরে উঠে তিন থেকে পাঁচ জন চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা কাজ করলে একদিনে প্রায় এক মণ বড়ি বানানো সম্ভব। কেউ কেউ বেশিও বানাতে পারেন। ৮০০-৯০০ গ্রাম ডাল, কিছু কালোজিরা ও একটু পাকা কুমড়া দিয়ে তৈরি হয় এক কেজি কুমড়া বড়ি। এরপর এগুলো কাপড়ে বসিয়ে দুই থেকে তিন দিন শুকানোর পর বিক্রি উপযোগী হয়। এ্যাংকর ডাল দিয়ে তৈরি এক কেজি বড়ি তৈরিতে এবছর খরচ পড়ছে ৬০-৭০ টাকা। মেশিনে ডাল পেস্ট করলে খরচ ১০ টাকা বাড়ে। আর এসব বড়ি কারিগররা পাইকারী বিক্রি করেন ৯০-১১০ টাকায়। পাবনায় তৈরি এসব বড়ি শুধু জেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এসব বড়ি যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। পাঠানো হয় প্রবাসী স্বজনদের কাছেও। এভাবেই তরকারিতে অতিরিক্ত স্বাদ বৃদ্ধির এ রসনা উপকরণ বিস্তৃতি পাচ্ছে জেলাতে। বাড়তি আয়ে স্বচ্ছলতা বাড়ছে গ্রামীণ পরিবারগুলোতে। চাটমোহরের দোলং গ্রামের উষা রাণী বলেন, ‘এই গ্রামে আমরা বেশকিছু পরিবার ৫০ বছর ধরে বড়ি তৈরি করে আসছি। আগে পাটায় ডাল পিষতে হতো। এখন অনেকেই মেশিনে সেই কাজটি করে। কষ্টসাধ্য হলেও এ থেকে আমাদের ভালোই আয় হয়।’ ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা মধ্যপাড়ার আবু সাইদ বলেন, ‘ভোর তিনটায় উঠে সকাল ৭ টা পর্যন্ত কাজ করলে মণ খানেক বড়ি বানানো যায়। সকালে এগুলো বানিয়ে বাজারগুলোতে পাইকারী ১০০ টাকা দরে বিক্রি করি। কেজিতে ২০-৩০ টাকা লাভ হয়। এতে সাধারণ আয়ের সঙ্গে এই বাড়তি আয়ে আমরা ভালোই আছি।’ রতনপুরের মাসুরা বেগম বলেন,‘ শীতের পুরো সময় আমরা বড়ি বানাই। আগেরদিন এ্যাংকর ডাল ভিজিয়ে রেখে পরদিন বানাই। এরপর রোদে শুকানোর পর বাড়ির পুরুষ ছেলেরা বিক্রি করে। কোনো কোনো বাড়িতে আবার পুরুষরাও এই কাজ করে।’ পাবনা বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক শামীম হোসেন বলেন, ‘বড়ি তৈরি করে উদ্যোক্তাদের বাড়তি উপার্জন অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোক্তারা যদি আমাদের সহযোগিতা চান তবে অবশ্যই সেটি দেওয়া হবে। প্রয়োজনে স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তের ঋণ পেতে সহযোগিতা করা হবে। বিক্রয় বিপননে সহযোগিতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।’ আরও পড়ুনদক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়বো স্বদেশএসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর আলমগীর হোসাইন নাবিল/কেএসকে