বিক্রেতাদের হাত ঘুরলেই বাড়ছে এলপি গ্যাসের দাম!

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের বাজারে চলছে চরম নৈরাজ্য। দাম বাড়িয়েও বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ সরকার। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সরকার ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের কারণেই এলপিজি বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।সবশেষ গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবে সেই গ্যাসই এখন নগর থেকে গ্রাম-সবখানেই বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকার বেশি দামে। এতে চরম চাপের মুখে পড়েছেন ভোক্তারা। ভোক্তাদের অভিযোগ, নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও মিলছে না পাইপলাইনের গ্যাস। বাধ্য হয়ে রান্নার জন্য সিলিন্ডার কিনতে হলেও দাম বেশি, আবার সব সময় গ্যাস পাওয়া যায় না। নির্ধারিত দাম থাকলেও বিক্রেতাদের হাত ঘুরলেই এলপিজির দাম বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। আরও পড়ুন: এলপিজিতে নৈরাজ্য: সরকারের ব্যর্থতা, নাকি ব্যবসায়ীদের কারসাজি? এলপিজি ব্যবসায়ীদের মতে, এই দামের পেছনে রয়েছে জটিল সরবরাহ ব্যবস্থা। সেফটেক এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ লিয়াকত আলী বলেন, এলপিজি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর একটি পণ্য। আমদানি হওয়ার পর ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে এলপিজিকে দুই থেকে তিনটি ধাপ পার হতে হয়। তিনি বলেন, কোথাও সিলিন্ডার সরাসরি ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে যায়, কোথাও অপারেটরের মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউটর কিংবা ডিলারের কাছে পৌঁছায়, আবার কোনো ক্ষেত্রে অপারেটর সরাসরি শেষ ব্যবহারকারীর কাছেও সরবরাহ করে। ফলে একক কোনো পদ্ধতিতে এলপিজি ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। চলমান সংকট কাটাতে বিইআরসি ও ডিস্ট্রিবিউশন টিমের মধ্যে সমন্বয় জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ডিস্ট্রিবিউশন টিমের দাবি আর বিইআরসির দফাগুলোর মধ্যে সমন্বয় হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযানের সমালোচনা করে প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও অপারেটরদের। বাংলাদেশে প্রতি মাসে কত এলপিজি প্রয়োজন, সে বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা থাকলে এই সংকট তৈরি হতো না। অপারেটরদের এলসি জটিলতা বা জাহাজ সংকটের সময় সরকার যদি আর্থিক সহায়তা কিংবা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট অনুমোদনে সহযোগিতা করত, তাহলে সরবরাহে এই শূন্যতা তৈরি হতো না। শুধু দাম সমন্বয় করলেই সংকট কাটবে-এমন ধারণার সঙ্গেও একমত নন তিনি। তার মতে, এলপিজিতে তিন ধরনের দাম রয়েছে-ইমপোর্ট প্রাইস, গেট প্রাইস ও অ্যান্ড প্রাইস। এই তিন দামের মধ্যে যে প্রফিট মার্জিন থাকবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ইম্পোর্টার, সরকার ও ডিস্ট্রিবিউটর-এই তিন পক্ষের সমন্বয়ে সেই মার্জিন নির্ধারণ করা গেলে তবেই ভোক্তা পর্যায়ে ন্যায্য দামে এলপিজি পৌঁছানো সম্ভব হবে। আরও পড়ুন: কারসাজিতে বেড়েছে এলপি গ্যাসের দাম: জ্বালানি উপদেষ্টা এদিকে এলপিজির দাম বৃদ্ধিতে কারসাজির কথা স্বীকার করেছেন খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, বিইআরসি দাম কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও একদল অসাধু ব্যবসায়ী সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই সিন্ডিকেট তৈরি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বাজারে অস্বাভাবিকভাবে এলপিজির দাম বেড়ে গেছে, যার কোনো বাস্তব কারণ নেই। তবে ডিলাররা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, বর্তমানে তীব্র সরবরাহ সংকট চলছে। ৩০টির মধ্যে প্রায় ২৫টি কোম্পানির কাছেই গ্যাস নেই। ফলে তারা চাইলেও ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন ওই কোম্পানিগুলোর গ্রাহকরা। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, ভোক্তা অধিদফতরের অভিযান দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, যা সংকট পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করছে। এর প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব বলছে, সরকার যদি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করে এবং নীতিগত সহায়তা দেয়, তাহলে আগামী মাসেই সংকট কাটতে পারে। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, জানুয়ারিতে আমদানি করা গ্যাস ফেব্রুয়ারিতে এসে পৌঁছাবে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। তবে নীতিগত সহায়তা না পেলে এই সংকটের দায় ব্যবসায়ীরা নিতে পারবে না। অন্যদিকে, বাজারের এই অরাজকতার জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশকেই দায়ী করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, বছরের পর বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সরকার নিজেই দায়ী এবং ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে ভোগান্তিতে রেখে ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিচ্ছে। আরও পড়ুন: এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট কমাতে এনবিআরকে জ্বালানি বিভাগের চিঠি বিগত সরকারের আমলে সরকারি উদ্যোগে এলপিজি রিজার্ভার তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এলপিজি খাতটি পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলেও মনে করেন ড. শামসুল। তিনি বলেন, সরকার শুধু দায়সারা বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ সংকট সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। তাৎক্ষণিক সমাধান হলো-সরকারি উদ্যোগে এলপিজি আমদানি, নতুন লাইসেন্স ইস্যু এবং বিকল্প ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করা। এদিকে এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি পাঠিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তবে ভোক্তারা বলছেন, কাগজে-কলমে সিদ্ধান্ত নয়-বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণই এখন সবচেয়ে জরুরি।