তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কোনো অবস্থায়ই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত নয়। এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে তা দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে এবং এর প্রভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্নোটেক্স গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এস এম খালেদ। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশের রপ্তানি কার্যক্রমের সার্বিক পারফরম্যান্স নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইব্রাহীম হুসাইন অভি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণ কী?রপ্তানি আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের কারণ রয়েছে, যার মধ্যে ট্রাম্প শুল্ক ও দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে এই মন্দার একটি বড় কারণ হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা। নির্বাচন শেষ হয়ে যদি একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হয়, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির পর, তাহলে ক্রেতাদের আস্থা কিছুটা ফিরতে পারে এবং অর্ডার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। গত এক-দুই বছরে আমরা খুব বেশি ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রতিফলন দেখিনি। যদি সরকার ইউটিলিটি খরচ, উৎপাদন ব্যয়, কমপ্লায়েন্স ও ক্রেতা অর্ডার–সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আরও মনোযোগ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে শিল্পখাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে তবে আমাদের শুধু দেশীয় পরিস্থিতির দিকে তাকালেই হবে না। বিশ্ব অর্থনীতিও এখন ভালো অবস্থায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতির কারণে সেখানে চাহিদা কমেছে। ইউরোপ, কানাডাসহ অন্য দেশেও ট্যারিফ ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেছে। আরও পড়ুনরপ্তানি আয় কমছে কেন?নতুন বছরে দেশের অর্থনীতি: সংকটের মধ্যেও পুনরুদ্ধারের আশা২০২৬ সালে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াবেএখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচনের পর কী হবে দেশীয় বাজারেও স্থানীয় অর্ডারের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। একই সঙ্গে ইউটিলিটি খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রণোদনা ও তহবিল কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে ব্যবসার পরিবেশ খুব একটা অনুকূলে নেই। এটা অব্যাহত থাকে, তাহলে শিল্পখাতে কোন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি আমাদের শিল্পের ও দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো খবর নয়। তৈরি পোশাক শিল্প মূলত স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক প্রবণতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, কর্মসংস্থান কমবে এবং এর প্রভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে। তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপরই মূলত আমাদের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু এর বাইরে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ, অভ্যন্তরীণ বাজার কিংবা খুচরা ব্যবসা—কোনো ক্ষেত্রেই তেমন ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কম, ক্রেতারা মূল্য সংবেদনশীল এবং কম দামে পণ্য সংগ্রহে আগ্রহী। এই পরিস্থিতিতে মজুরি বৃদ্ধি যদি উৎপাদন দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও কস্ট অপ্টিমাইজেশনের সঙ্গে সমন্বয় না করা হয়, তাহলে রপ্তানি অর্ডার অন্য দেশে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে ফলে কর্মসংস্থানের অবস্থাও আশানুরূপ নয়। ব্যবসার পরিবেশ অনিশ্চিত থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়। সরকার সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিলে তা অবশ্যই সমর্থন করি এবং একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। তবে একই সঙ্গে ব্যবসা খাতকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসাবান্ধব নীতি ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়ন করতে পারে না। গত এক-দুই বছরে আমরা খুব বেশি ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রতিফলন দেখিনি। যদি সরকার ইউটিলিটি খরচ, উৎপাদন ব্যয়, কমপ্লায়েন্স ও ক্রেতা অর্ডার–সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আরও মনোযোগ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে শিল্পখাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে কেন? মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক। তবে হঠাৎ করে এবং উৎপাদনশীলতা না বাড়িয়ে যদি মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়, তাহলে তা রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ, আমাদের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উৎপাদন খরচ ইতোমধ্যেই বেড়ে গেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কম, ক্রেতারা মূল্য সংবেদনশীল এবং কম দামে পণ্য সংগ্রহে আগ্রহী। এই পরিস্থিতিতে মজুরি বৃদ্ধি যদি উৎপাদন দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও কস্ট অপ্টিমাইজেশনের সঙ্গে সমন্বয় না করা হয়, তাহলে রপ্তানি অর্ডার অন্য দেশে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ব্যবসায়িক সম্প্রদায় ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত এবং ইতিবাচক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে এই যোগাযোগ কিছুটা কম ছিল। এটি বাড়লে ব্যবসার জন্য ভালো হবে। সরকার যদি ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ায় ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা নেয়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান স্থিতিশীল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে তাই মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরকারিভাবে কিছু ব্যয় কমানোর সহায়তা দেওয়া হলে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে। আগামী দিনে নির্বাচিত সরকারের কাছে আপনার প্রধান প্রত্যাশা কী?আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ। সরকার যদি ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে বসে তাদের সমস্যাগুলো শোনে এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের চেষ্টা করে, তাহলে অনেক সমস্যাই সহজে সমাধান করা সম্ভব। আমাদের অনেক সমস্যাই খুব জটিল নয়। সামান্য কিছু নীতিগত সহায়তা, ইউটিলিটি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিলেই ব্যবসায় আস্থা ফিরে আসতে পারে। রাজনৈতিক দল, সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংলাপ বাড়লে কি ব্যবসায়িক আস্থা ফিরবে বলে আপনি মনে করেন? নিশ্চয়। ব্যবসায়িক সম্প্রদায় ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত ও ইতিবাচক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে এই যোগাযোগ কিছুটা কম ছিল। এটি বাড়লে ব্যবসার জন্য ভালো হবে। সরকার যদি ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ায় ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা নেয়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান স্থিতিশীল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে। আমরা আশা করি সরকার ভবিষ্যতে ব্যবসাখাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দেবে। রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে বের হতে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন? রপ্তানি খাতকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে রক্ষা করতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্পষ্টতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ফিরে আসে। দ্বিতীয়ত, ইউটিলিটি খরচ (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নগদ সহায়তা, কর সুবিধা ও রপ্তানি প্রণোদনার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদে শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য।চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতে সুদের হার সহনীয় রাখা এবং ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা দরকার। পঞ্চমত, সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে এবং ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রবণতা ফিরতে পারে। আইএইচও/এএসএ/এমএফএ/জেআইএম