গ্রিনল্যান্ডের দখলদারত্ব আজ আর কোনো কল্পনা বা রাজনৈতিক বক্তব্যের স্তরে নেই। এটি বাস্তব ক্ষমতার প্রয়োগের প্রস্তুতি। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রকাশ্যেই এই ভূখণ্ডকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের পথও খোলা রেখেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং বৈশ্বিক শক্তি ব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্বের স্পষ্ট উদাহরণ। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই দখলদারত্বের লক্ষ্য এমন একটি দেশ, যা ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ একটি সামরিক জোটের ভেতর থেকেই সেই জোটের সদস্য বা অংশীদার রাষ্ট্রকে হুমকি দেওয়া বা শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যদি ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যেই এমন দখলদার মানসিকতা বৈধতা পায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই জোটের প্রয়োজনীয়তা কোথায়। একইভাবে প্রশ্ন ওঠে জাতিসংঘের অস্তিত্ব নিয়েও। জাতিসংঘের নীতি উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্র পরিচালকের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, তাকে কার্যত তার দেশ থেকে তুলে এনে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। যদি কোনো দেশের সরকার কে বৈধ আর কে অবৈধ, তা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সুবিধামতো ঠিক করে দেয়, তাহলে জাতিসংঘের নীতিমালা কাগজের বাইরে কোথায় কার্যকর। এই প্রশ্ন ইউক্রেন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, কিংবা কোনো একটি রাষ্ট্র পর্যন্ত নয়। আজ যদি হঠাৎ কোনো দেশের ওপর আক্রমণ হয় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো কেবল বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে, তাহলে সেই সংগঠনগুলোর বাস্তব ভূমিকা কী। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও একই সংকট। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, অথচ বাস্তবে স্বৈরতন্ত্র, দমননীতি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে দেশ পরিচালিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র শব্দটির অর্থ কী থাকে। আইন থাকলেও যদি তা প্রয়োগ না হয়, গণমাধ্যম থাকলেও যদি তারা সত্য প্রকাশ করতে না পারে, মত প্রকাশের অধিকার থাকলেও যদি মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, তাহলে এসব কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এমনকি দৈনন্দিন জীবনের সহজ উদাহরণেও এই সংকট স্পষ্ট। যদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নব্বই শতাংশ তথ্য ভুল হয়, তাহলে সেই তথ্য জানার মূল্য কোথায়। একই প্রশ্ন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি অর্থ, স্বার্থ ও ঘোষিত মূল্যবোধের প্রশ্নে ইউরোপ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে এই জোট কীসের প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রশ্নগুলো আবেগের নয়, এগুলো বাস্তবতার প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলো না উঠলে বরং সেটাই নাগরিক চেতনার ব্যর্থতা হতো। সমসাময়িক বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংকট স্পষ্ট। এটি শুধু কার্যকারিতার ব্যর্থতা নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু ন্যায়ের নিশ্চয়তা নেই। নিয়ম আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। আদর্শের কথা বলা হয়, কিন্তু দায়িত্ব পালনের সাহস দেখা যায় না। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নিজের নৈতিক ভিত্তি হারাচ্ছে। ন্যাটো, জাতিসংঘ কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলো গড়ে উঠেছিল শক্তির ভারসাম্য রক্ষা ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে। ধারণা ছিল, নিয়ম শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। শক্তিধর রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়, আগ্রাসনের ইঙ্গিত দেয় কিংবা আন্তর্জাতিক নিয়ম ভেঙে ফেলে, তখন এই সংগঠনগুলো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। গ্রিনল্যান্ড হোক বা ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ, মূল সংকট একই জায়গায়। নিয়ম দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য কঠোর, আর শক্তিধর রাষ্ট্রের জন্য নমনীয়। এই নির্বাচনি নৈতিকতাই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করছে। গণতন্ত্রের নামে যদি স্বৈরতন্ত্র, দমননীতি বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পরিচালিত হয়, তাহলে গণতন্ত্র শব্দটি অর্থহীন স্লোগানে পরিণত হয়। শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম, ক্ষমতার জবাবদিহি ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি মুখোশ। আইন থাকলেও প্রয়োগ না হলে, গণমাধ্যম সত্য প্রকাশ না করলে, বাকস্বাধীনতা থাকলেও ভয় কাজ করলে, এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বাস্তবে কাগুজে হয়ে পড়ে। ওয়েদার ফোরকাস্টের উদাহরণটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তথ্য জানতে চায় নির্ভরতার জন্য। কিন্তু যখন বারবার তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়, তখন মানুষ শুধু একটি তথ্য নয়, পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়। আজ এই অবস্থা শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নয়। রাজনীতি, গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংস্থা সর্বত্রই বিশ্বাসের ভাঙন স্পষ্ট। তথ্য আছে, কিন্তু বিশ্বাস নেই। আর বিশ্বাস ছাড়া কোনো ব্যবস্থাই টিকে থাকতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে কী করণীয় ও বর্জনীয় এই সমস্যার সমাধানে? প্রথমত, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে নৈতিক নিরপেক্ষতা ও নিয়মের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য এক নিয়ম আর দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য আরেক নিয়ম চলতে পারে না। এই দ্বৈত মানদণ্ডই পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। গণতন্ত্র মানে মানুষের অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণতন্ত্র কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য যাচাইয়ের যন্ত্র নয়। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমকে রাষ্ট্র ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত করতে হবে। অন্যথায় গণমাধ্যম সত্যের বাহক না হয়ে প্রপাগান্ডার যন্ত্রে পরিণত হবে, আর তখন জনমত ও বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক আরও বাড়বে। চতুর্থত, নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি দমন নয়, উৎসাহিত করতে হবে। কারণ প্রশ্নহীন সমাজে অন্যায় সবচেয়ে নিরাপদ থাকে। পঞ্চমত, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংগঠনগুলোকে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করতে হবে এবং সেই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সংস্কারের পথে যেতে হবে। আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। দ্বিমুখী নীতি ও নৈতিক সুবিধাবাদ বর্জন করতে হবে। শক্তির রাজনীতি দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ভান পরিত্যাগ করতে হবে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নাম ব্যবহার করে আগ্রাসন বৈধ করার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নীরবতা বর্জন করতে হবে। কারণ অন্যায়ের সামনে নীরবতা নিজেই একটি অবস্থান এবং তা সবসময় অন্যায়ের পক্ষেই যায়। আইন ও নীতিমালা নিয়ে কিছু না বললেই নয় ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন নিয়ম ভাঙছেন, এই প্রশ্নটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনে হলেও আসলে তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম কি যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাস্তবতা হলো, কাঠামো দুর্বল, প্রয়োগ সীমিত এবং জবাবদিহি কার্যকর নয়। আইনকে ধর্মগ্রন্থের মতো অপরিবর্তনীয় ধরে না নিয়ে, যে সময় ও বাস্তবতায় তা তৈরি হয়েছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, প্রয়োগযোগ্য এবং যাচাইযোগ্য কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক কাঠামো আজ স্পষ্টভাবে পুরোনো। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আইনকে বাধা নয়, সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই দোষ শুধু ট্রাম্পের নয়। দোষ সেই ব্যবস্থার, যা নিয়ম ভাঙাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছে।সমাধান সময়সাপেক্ষ হলেও দিকনির্দেশ স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক নীতিমালাগুলোকে পুনরায় যাচাই ও সংস্কার করতে হবে। কোন নিয়ম কার্যকর, কোনটি কেবল কাগজে আছে, কোন নিয়ম শক্তির সামনে ভেঙে পড়ছে এবং কোনটি সংস্কারযোগ্য, এই মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। কারণ যেখানে প্রশ্ন থেমে যায়, সেখানে নিয়ম নয়, শক্তিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com এমআরএম/জেআইএম