ইসলামের ইতিহাসে কিছু মনীষী আছে, যাদের জীবনের মূলমন্ত্র হলো জ্ঞান, আমল এবং আখলাক, এই তিনের সুষম সমন্বয়। তাদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা নুমান ইবনু সাবিত রহ. অন্যতম। তিনি শুধু একজন ফকিহ বা মুজতাহিদ ইমামই ছিলেন না; বরং মানবিক গুণাবলির জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তার জীবন হলো কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে জ্ঞান ও চরিত্রের মেলবন্ধন স্পষ্ট।সংক্ষিপ্ত পরিচয় ইমাম আবু হানিফা রহ. ৮০ হিজরীতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫০ হিজরীতে বাগদাদে ইন্তিকাল করেন। তিনি তাবেইন যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন এবং বহু সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত হানাফি মাজহাব আজ বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত অনুসৃত মাজহাব। (তারিখু বাগদাদ:১৩/ ৩২৭ ৩২৯) তাকওয়া ও আল্লাহভীতিতে অনন্য উচ্চতা ইমাম আবু হানিফা রহ.ছিলেন অত্যন্ত তাকওয়াশীল। তিনি হারাম ও সন্দেহজনক কাজ থেকে দূরে থাকতেন এবং বৈধ ব্যবসার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্ক ছিলেন। তার সতর্কতা ও আল্লাহভীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি বলেন, তিনি দুনিয়ার লোভে ইলম অর্জনকে কঠোরভাবে নিন্দা করতেন। সালাফে সালেহিনগণ এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন,দুনিয়ার উদ্দেশ্যে অর্জিত ইলম কখনো সফলতা আনে না।(জামি উল উলুম ওয়াল হিকাম: ৭২ ৭৪) ইবাদতে গভীরতা ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ইমাম আবু হানিফা রহ. দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন। অনেক বছর তিনি ইশা ও ফজরের নামাজ একই অজুতে আদায় করেছেন। রাতে কোরআনের আয়াত পড়ে তিনি কাঁদতেন এবং ফজর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন। এভাবে তিনি আল্লাহর নৈকট্য ও ইবাদতে গভীরতা প্রদর্শন করেছিলেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া:৬/২৩১ ২৩৪,সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৯৮) আরও পড়ুন: ইসলামের পথে সাহাবিদের নির্মম নির্যাতন সহ্যের ঘটনা বিনয় ও নম্রতার অনুপম দৃষ্টান্ত যদিও তিনি জ্ঞান ও মর্যাদায় মহান, তথাপি ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি নিজের মতকে কখনো চূড়ান্ত মনে করতেন না। তিনি বলতেন, هذا رأيي وهو أحسن ما قدرنا عليه، فمن جاءنا بأحسن منه قبلناه এটি আমার মত, যা আমার সাধ্যানুযায়ী সর্বোত্তম। কেউ যদি এর চেয়ে উত্তম কিছু নিয়ে আসে, আমরা তা গ্রহণ করব। (ইলামুল মুওয়াক্কিঈন:১২৪ ১২৭) মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও সহনশীলতা ইমাম আবু হানিফা রহ. মানুষের সাথে কোমল ও সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন, এমনকি তার বিরোধীদের সাথেও। এক ব্যক্তি তাকে প্রকাশ্যে অপমান করলেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন এবং পরে সেই ব্যক্তির খোঁজখবর নেন। (মানাকিবু আবি হানিফা: ১/৬৫ ৬৮) ন্যায় ও সত্যের পথে আপসহীনতা ইমাম আবু হানিফা রহ. অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। আব্বাসিয় খলিফা তাকে বিচারপতির পদ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ এতে সত্য কথা বলার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারত। ফলে তাকে কারাবরণ ও নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। (সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/১০৪ ১০৮) দানশীলতা ও মানবিকতা ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। তিনি ছাত্রদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতেন এবং কাউকে অপমান না করে সাহায্য করতেন। এমনভাবে দান করতেন, যেন গ্রহণকারী সম্মানিত অনুভব করে। (তারিখু বাগদাদ: ১৩/৩২৭ ৩২৯) ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর জীবন আমাদের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। এখানে ইলম আছে, কিন্তু অহংকার নেই; তাকওয়া আছে, কিন্তু রিয়াকারি নেই; ইবাদত আছে, কিন্তু গোঁড়া রীতিবোধ নয়; এবং চরিত্র আছে, যা কোরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত ব্যাখ্যা। আজকের সমাজে যেখানে জ্ঞান ও চরিত্রের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা যাচ্ছে, সেখানে ইমাম আবু হানিফা রহ. আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, উত্তম চরিত্র ছাড়া প্রকৃত ইলম পূর্ণতা পায় না।নিশ্চয়ই রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দান করার জন্য। (মুসনাদে আহমাদ: ৮৯৫২)