২০১৪, ১৮ ও ২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কমিশনের প্রতিবেদনে যা উঠে এলো

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) ‘সুপরিকল্পিত ও সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন।সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার হাতে এই প্রতিবেদন তুলে দেন কমিশন প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনসহ কমিটির সদস্যরা। এ সময় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলসহ সরকারের একাধিক উচ্চপদস্থ উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।প্রতিবেদন জমা দেয়া শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশনের সভাপতি সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন জানান, ২০০৮ সালের পর থেকেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে একটি গভীর ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা।বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, ‘যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার পথে কেয়ারটেকার সরকার ছিল বড় বাধা। এটি বাতিলের পর বেছে বেছে নিজেদের লোক দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মেধাবী কর্মকর্তাদের বাইপাস করে অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল। প্রশাসনের ভেতরে একটি ‘বিশেষ নির্বাচন সেল’ গঠন করা হয়েছিল, যারা মূলত নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করত।কমিশন প্রধান জানান, তারা পুলিশের ডিসি সমপর্যায়ের কর্মকর্তা, এনএসআই, ডিজিএফআই এবং এমনকি সেনাবাহিনীর একটি অংশের কর্মকর্তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এ ছাড়া জালিয়াতির এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টতার দায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকেও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আরও পড়ুন: বারবার ক্ষমতায় আসার পথে তত্ত্বাবধায়ক ছিল বড় বাধা: বিচারপতি শামীমকমিশন তাদের প্রতিবেদনে তিনটি নির্বাচনের ভিন্ন ভিন্ন অপকৌশল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে:২০১৪: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ‘বন্দোবস্ত’প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়া এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে তথাকথিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। মূলত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।২০১৮: ‘রাতের ভোট’ ও ১০০ শতাংশের বেশি ভোটদান২০১৮ সালে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর মিশন নিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার। কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়। প্রশাসনের ‘অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ কারণে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়।২০২৪: ‘ডামি’ প্রার্থীর অপকৌশলবিএনপিসহ বিরোধী দল অংশ না নেয়ায় এই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর জন্য ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করানোর অভিনব অপকৌশল গ্রহণ করা হয়। আরও পড়ুন: নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেই জাল টাকার বিস্তার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগকমিশন সদস্য সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন বলেন, ‘৫ আগস্টের অভ্যুত্থান না হলে নির্বাচনকে যেভাবে সাজানো হয়েছিল, তাতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল কখনোই জয়লাভ করতে পারত না।’প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলা হয়েছে–তা জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার।’তিনি বলেন, জনগণের টাকায় নির্বাচন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেয়া হয়েছে। যারা এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল, তাদের চেহারা উন্মোচন করা এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ডাকাতি না ঘটে, তার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আরও পড়ুন: নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়: বদিউল আলমনেপথ্যে ছিল ‘বিশেষ সেল’ ও প্রশাসনিক দখলদারিতদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘বিশেষ সেল’ এই ভোট জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরিয়ে মূলত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়।কমিশনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সুপারিশমালাও জমা দেয়া হয়েছে।উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে সরকার একটি কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনকে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সুপারিশ করারও দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।পাঁচ সদস্যের এই কমিশনের সভাপতি করা হয় হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে। সদস্য হিসেবে ছিলেন: সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম।