চট্টগ্রাম নগরের খুচরা দোকানগুলো থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে গেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার। সরকারের কর ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ এবং এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। নগরবাসী দ্বিগুণ দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। এ নিয়ে চলছে তীব্র ভোগান্তি। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেল থেকে ঘুরে দেখা গেছে, বাকলিয়া, চকবাজার, কল্পলোক আবাসিক এলাকা ও নিউ মার্কেটের আশপাশের অধিকাংশ দোকানেই এলপিজি সিলিন্ডার নেই। দোকানিরা জানান, ডিলাররা পর্যাপ্ত সরবরাহ দিচ্ছেন না অথবা বাড়তি দামে সিলিন্ডার ছাড়ছেন। এতে খুচরা পর্যায়ে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। চকবাজারের বিসমিল্লাহ ট্রেডিংয়ের মালিক শাহ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিলার সিলিন্ডার দিচ্ছে না। ফোন দিলে কলও রিসিভ করে না। আবার মাঝেমধ্যে দিনের কোনো একসময় চালান আসলে বাড়তি দামে কিনতে হয়। ফলে ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়।’ তবে ডিলারদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, সরকার নির্ধারিত নতুন দাম কার্যকর হতে সময় লাগে। নতুন দামে সিলিন্ডার সরবরাহ শুরু হলে সংকট কেটে যাবে এবং খুচরা বাজারে দাম স্বাভাবিক হবে। বাকলিয়া এলাকার ডিলার মো. রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোম্পানি থেকে আমাদের কোনো সরবরাহ নাই। যার ফলে আমরা বিক্রি করতে পারছি না। যখন আমাদের হাতে ছিল তখন ১৩৭০ থেকে ১৪০০ টাকায় (১২ কেজির সিলিন্ডার) বিক্রি করেছি। এখন সরবরাহ নাই, তাই বিক্রি করতে পারছি না।’ নিউ মার্কেট এলাকার আরেক ডিলার সাজ্জাদ বলেন, ‘গ্রাহকরা আমাদের প্রতিনিয়ত বিরক্ত করলেও কিছু করার নাই। কোম্পানি থেকে সরবরাহ না থাকার ফলে সাধারণ মানুষের চাহিদা মেটাতে পারছি না।’ এলপিজির এই সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে হোটেল-রেস্তোরাঁ, চা দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম চাপে। রান্না ও ব্যবসা পরিচালনায় খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। বাকলিয়ার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ‘আজ একসপ্তাহ ধরে গ্যাস-সংকটে ভুগছি। প্রথম দুইদিন পাশের ফ্ল্যাটের গ্যাস থেকে রান্না করেছি। এখন রাইস কুকারে রান্না করে খেতে হচ্ছে। একসপ্তাহ হয়ে গেল, কিন্তু গ্যাসের দেখা মিলছে না। আমাদের এ দুর্ভোগের অবসান ঘটবে কবে?’ যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিএম এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এলসি (ঋণপত্র) করেছি একমাস আগে। এলপি গ্যাসের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বন্দরে না আসাতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।’ ডিলাররা অভিযোগ করছেন যে মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে গ্যাসের সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো সিন্ডিকেট নাই। এমন তথ্য মিথ্যা। আমরা সরবরাহ পেলে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ দেব।’ এ নিয়ে কথা হলে এলপিজি ব্যবসায়ীদের বক্তব্যকে গতানুগতিক বলে মন্তব্য করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ‘এখন ব্যবসার অপর নাম মানুষকে জিম্মি করে পকেট কাটা। আমদানি কম হলে সেটা এক মাস আগে জানানোর কথা। কারণ এলপিজি দেশে আসতে সময় লাগে কমপক্ষে এক মাস। হঠাৎ শীত প্রকট হলে, লাইনের গ্যাসে সংকট দেখা দিলে, এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও। বিষয়টিতে পরিষ্কার- এখানে আমদানিকারক, তাদের ডিস্ট্রিবিউটর ও পাইকারি-খুচরা বিক্রেতাদের কারসাজি আছে।’ নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, ‘ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যখন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম আদায়কারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে, তখন তারা পালিয়ে যাচ্ছেন, দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন এবং সর্বশেষ ধর্মঘট করে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখছেন। এটা সরকারের আইনের প্রতি পুরোপুরি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনাকালে সর্বত্রই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্সবিহীন দোকান, বেশি দামে বিক্রিসহ নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও তারা বলেন হয়রানি করা হচ্ছে। বিষয়টি সরকারকে বেকায়দায় ফেলানোর চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়। এটি জনগণকে জিম্মি করে মানুষের পকেট কাটা ও মুনাফা লাভের অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।’ এমআরএএইচ/একিউএফ