শীতের প্রস্রাবের চাপ, লুকিয়ে থাকতে পারে কিডনির সংকেত

শীত এলেই অনেকের জীবনে এক অস্বস্তিকর অভ্যাস যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে, বারবার প্রস্রাবের চাপ। কনকনে ঠান্ডায় কম্বলের ভেতর থেকে উঠে বারবার বাথরুমে যাওয়া বিরক্তিকর বলেই নয়, অনেকেই এটিকে শীতের স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। পানি খাওয়া কমিয়ে দেওয়াকেও মনে করেন সহজ সমাধান। কিন্তু এই অতিরিক্ত প্রস্রাবের চাপ কি সব সময়ই নিরীহ? চিকিৎসকদের মতে, শীতকালে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়া অনেক সময় শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি কিডনির ওপর বাড়তি চাপ বা লুকিয়ে থাকা সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই শীতের এই পরিচিত অস্বস্তির পেছনে থাকা সংকেতগুলো বোঝা জরুরি। শীতে প্রস্রাবের চাপ বাড়ে কেন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, শীতকালে বারবার প্রস্রাবের চাপ সাধারণত শরীরের একটি স্বাভাবিক অভিযোজন প্রক্রিয়া। ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীর নিজের তাপমাত্রা ধরে রাখতে ভেতরে ভেতরে কিছু পরিবর্তন ঘটায়, যার প্রভাব পড়ে কিডনির কার্যক্রমে। তাপমাত্রা কমে গেলে ত্বকের কাছাকাছি থাকা ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। এতে ত্বক দিয়ে তাপ বের হওয়া কমে এবং রক্ত প্রবাহ শরীরের কেন্দ্রীয় অঙ্গগুলোর দিকে চলে যায় বিশেষ করে কিডনির দিকে। কিডনিতে রক্তের প্রবাহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাব তৈরির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি শীতে ঘাম কম হওয়ায় শরীরের অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে যাওয়ার প্রধান পথ হয়ে ওঠে প্রস্রাব। এ কারণেই ঠান্ডার সময়ে প্রস্রাবের চাপ বেশি অনুভূত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সাময়িক এবং ক্ষতিকর নয়। তবে সব পরিস্থিতিতে একে হালকাভাবে নেওয়াও ঠিক নয়। কখন গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন? শীতকালে দিনে কয়েকবার বেশি প্রস্রাব হওয়া সাধারণ ঘটনা হলেও, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব কিছু ক্ষেত্রে কিডনির ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ, যারা শারীরিকভাবে কম সক্রিয় জীবনযাপন করেন অথবা আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো সমস্যায় ভুগছেন তাদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শীতকালে অনেকের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেড়ে যায়। কারণ ঠান্ডায় রক্তনালী সংকুচিত হয় এবং চলাফেরা কমে আসে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা ধীরে ধীরে কিডনির ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিডনি দুর্বল হতে শুরু করলে প্রস্রাব ঘন করার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে পাতলা প্রস্রাব তৈরি হয় এবং এর ফলেই বারবার বাথরুমে যেতে হয়, বিশেষ করে রাতের বেলায়। অনেক সময় এটিই কিডনি সমস্যার প্রাথমিক সতর্ক সংকেত। আরও পড়ুন:  শীতে নারীদের হাত-পা কেন পুরুষের তুলনায় বেশি ঠান্ডা হয়? শীতে ঠান্ডা পানি স্বাস্থ্যকর নাকি শুধু স্বস্তির অনুভূতি চোখের অসুখ নাকি সাধারণ মাথাব্যথা? যা বলেছেন চিকিৎসক কোন লক্ষণগুলো দেখলে সাবধান হবেন? প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা দুর্বল বা থেমে থেমে প্রস্রাব হওয়া প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা যাওয়া মুখ, পা বা চোখের নিচে ফোলা ভাব অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শক্তিহীনতা প্রস্রাবে বেশি ফেনা সাধারণত প্রোটিন ক্ষয়ের লক্ষণ, যা কিডনি ক্ষতির প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে। এছাড়াও প্রস্টেটের সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা মূত্রনালির সংক্রমণের কারণেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কেন সতর্কতা জরুরি? কিডনির রোগের বড় সমস্যা হলো শুরুর দিকে এটি প্রায় নীরবেই এগোয়। অনেক সময় উল্লেখযোগ্য উপসর্গ দেখা দেয় তখনই, যখন ক্ষতি অনেকটাই হয়ে গেছে। অথচ কিছু সাধারণ পরীক্ষা যেমন ইউরিন পরীক্ষা, রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা যাচাই, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা খুব সহজেই কিডনির ওপর চাপ বা ক্ষতির ইঙ্গিত ধরতে পারে। কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন? শীতের মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি বারবার প্রস্রাবের চাপ থেকে যায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যাদের পরিবারে কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। শীতে বারবার প্রস্রাবের চাপ অনেক সময় শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি বড় সমস্যার আগাম সংকেত হতে পারে। নিজের শরীরের পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা ও পরামর্শ নিলেই জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক জেএস/