রাজনীতি আসলে কী—এই প্রশ্নটি যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই গভীর। এমনিতে যারা সমাজ ও দেশের উন্নয়নের জন্য, কোনো একটি দলের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে, তাদের সেই কাজকে আমরা রাজনীতি বলে থাকি। রাজনীতি হলো মানুষের মধ্যে থাকা ভিন্নমত, স্বার্থ ও চাহিদার পার্থক্যকে মীমাংসা করে সবাইকে নিয়ে চলার একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। সমাজে কে কী পাবে, কীভাবে থাকবে, কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকবেই। কলহে না গিয়ে সেই মতভেদকে আলোচনা, সমঝোতা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমাধান করার ব্যবস্থাই রাজনীতি। সহজভাবে বললে, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত—যেখানেই একাধিক মানুষের স্বার্থ জড়িত, সেখানেই নিয়ম তৈরি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়, আর সেই প্রয়োজন পূরণের প্রক্রিয়াই রাজনীতি। রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল বা সরকার পরিচালনার বিষয় নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সুশৃঙ্খল, ন্যায্য ও বাসযোগ্য করে তোলার একটি দলগত প্রয়াস। এই রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন রাজনীতিবিদ। রাজনীতিবিদ এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নীতি নির্ধারণে অংশ নেন, সাধারণত কোনো রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে বা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হন। রাজনীতিবিদরা আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কায়দা-কানুন কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্তগ্রহণে প্রভাব রাখেন। তাদের মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা জনগণের সেবা, রাষ্ট্রের কল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন। অর্থাৎ রাজনীতিবিদ মানেই কেবল ক্ষমতাধর ব্যক্তি নন; যিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তিনিই রাজনীতিবিদ। প্রাচীনকালে এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শুরুর দিকেও রাজনীতি অনেকটাই ছিল সেবামূলক। রাজনীতিতে আসা মানে ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। রাজনীতিবিদদের জীবনে ত্যাগ, আদর্শ ও দেশপ্রেম ছিল মুখ্য। ব্যক্তিগত লাভের আশা নয়, বরং জনগণের সেবা, রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের মূল প্রেরণা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনীতির সংজ্ঞাও ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালেই এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়। নব্বইয়ের দশক পর্যন্তও অনেক রাজনীতিবিদের কোনো নির্দিষ্ট পেশাগত পরিচয় ছিল না। রাজনীতিই ছিল তাঁদের প্রধান কাজ, প্রধান পরিচয়। তারা রাজনীতির মাধ্যমেই জনগণের সেবা করবেন—এই অঙ্গীকারেই সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসা ও অন্যান্য পেশার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। আজ রাজনীতির মাঠে এমন নেতার সংখ্যা বাড়ছে, যারা একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরামর্শক বা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত। ভোটের রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের হিসাবও তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ফলে রাজনীতি ও পেশার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে গেছে। এই প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাচাই–বাছাই শেষে বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে ৪৪ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী। সংখ্যার হিসেবে এটি প্রায় অর্ধেক। অথচ রাজনীতিই যাদের একমাত্র পেশা—এমন প্রার্থী আছেন মাত্র ২৬ জন। এই পরিসংখ্যান নিছক তথ্য নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। সংসদ, যা হওয়ার কথা ছিল সমাজের নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক, তা ক্রমেই হয়ে উঠছে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্যপূর্ণ একটি মঞ্চ। ব্যবসায়ীদের পর প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, কৃষিজীবী ও সাবেক সরকারি কর্মচারীরা। কিন্তু সংখ্যার ভারসাম্য দেখলেই বোঝা যায়, রাজনীতিতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিচ্ছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকায় ব্যবসায়ীদের আধিক্য শুধু কোনো একটি দলের বৈশিষ্ট্য নয়; এটি প্রায় সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই সত্য। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন—সবখানেই ব্যবসায়ী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ এটি কোনো দলীয় ব্যতিক্রম নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। এই বাস্তবতার পেছনে রয়েছে রাজনীতি ও অর্থের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক। ক্ষমতায় যেতে রাজনৈতিক দলগুলোর বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়—নির্বাচনী প্রচার, সংগঠন পরিচালনা, কর্মী ধরে রাখা—সবকিছুর সঙ্গেই অর্থ জড়িত। সেই অর্থ জোগান দিতে পারেন মূলত ব্যবসায়ীরাই। ফলে প্রার্থী মনোনয়নের সময় দলগুলো স্বাভাবিকভাবেই এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়, যাদের আর্থিক সক্ষমতা আছে। এর বিনিময়ে ব্যবসায়ীরাও রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পান, কারণ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে ব্যবসার জন্য নীতিগত সুবিধা, প্রভাব ও নিরাপত্তা পাওয়া সহজ হয়। এভাবেই রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যে এক ধরনের ‘বিনিময় প্রথা’ গড়ে উঠেছে। রাজনীতির ভবিষ্যৎ তাই শুধু নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আমরা রাজনীতিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি তার ওপর। রাজনীতি যদি আদর্শ, নৈতিকতা ও জনগণের কল্যাণের জায়গা হারায়, তাহলে রাষ্ট্রও তার নৈতিক দিকনির্দেশনা হারায়। সেই কারণেই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—আমরা কি রাজনীতিকে আবার রাজনীতিবিদদের, অর্থাৎ আদর্শনিষ্ঠ ও দায়িত্ববান মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারব, নাকি রাজনীতি ক্রমেই একটি বিশেষ শ্রেণির নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর কারণ সংসদ সদস্য হওয়াকে এখন অনেকেই বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন—যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে এক ধরনের জাদুর কাঠি যুক্ত আছে এবং সেখান থেকে মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতিকে আদর্শের জায়গা থেকে সরিয়ে এনে লাভ–লোকসানের হিসাবের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলছে। রাজনীতি তখন আর সেবার ক্ষেত্র থাকে না; হয়ে ওঠে সম্ভাব্য লাভের একটি মাধ্যম। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—রাজনীতিবিদ বলতে আমরা কাকে বুঝব? জার্মান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ১৯১৯ সালে রাজনীতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি একটি পেশা। কিন্তু ওয়েবারের কাছে রাজনীতি মানে কেবল জীবিকা নয়; এটি দায়িত্ব, নৈতিকতা ও লক্ষ্যবোধের সঙ্গে যুক্ত একটি পেশা। তাঁর মতে, একজন রাজনীতিবিদের নৈতিক মেরুদণ্ড থাকতে হবে, থাকতে হবে সমাজ ও মানুষের কল্যাণের স্পষ্ট উদ্দেশ্য। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা হতে হবে দায়িত্বশীল ও মূল্যবোধনির্ভর। নইলে রাজনীতি পরিণত হবে কেবল ক্ষমতার লোভে। ওয়েবার আরও সতর্ক করেছিলেন, একজন রাজনীতিবিদ শুধু ভোট পাওয়ার জন্য অযৌক্তিক বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন না। তার কাজের পেছনে যুক্তি, লক্ষ্য ও দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। কিন্তু আজকের রাজনীতিতে আমরা প্রায়ই দেখি জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যা, যার অনেকটাই বাস্তবে রূপ নেয় না। এতে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং রাজনীতিবিদদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ব্যবসায়ী প্রার্থীর আধিক্য রাজনীতিকে আরেকটি দিক থেকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। সংসদ যদি মূলত একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে সমাজের অন্য শ্রেণি—কৃষক, শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত, পেশাজীবী মধ্যবিত্ত—তাদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার যথাযথ প্রতিফলন নীতিনির্ধারণে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান যথার্থই বলেছেন, ক্ষমতায় যেতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বাস্তবতার প্রয়োজনে জরুরি হতে পারে, কিন্তু সংসদ একচেটিয়াভাবে ব্যবসায়ীদের দিয়ে ভরে গেলে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার সমন্বয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ গঠনের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। সব মিলিয়ে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে—রাজনীতি কি সত্যিই রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হচ্ছে? হয়তো আরও নির্ভুলভাবে বলা যায়, রাজনীতি হাতছাড়া হচ্ছে সেই মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা রাজনীতিকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে দেখতেন। রাজনীতি চলে যাচ্ছে এমন এক শ্রেণির হাতে, যাদের কাছে এটি আরেকটি মাধ্যম—ক্ষমতা বাড়ানোর, প্রভাব বিস্তারের কিংবা আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার। এই পরিবর্তনকে যদি আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, তাহলে রাজনীতি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। রাজনীতির ভবিষ্যৎ তাই শুধু নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আমরা রাজনীতিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি তার ওপর। রাজনীতি যদি আদর্শ, নৈতিকতা ও জনগণের কল্যাণের জায়গা হারায়, তাহলে রাষ্ট্রও তার নৈতিক দিকনির্দেশনা হারায়। সেই কারণেই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—আমরা কি রাজনীতিকে আবার রাজনীতিবিদদের, অর্থাৎ আদর্শনিষ্ঠ ও দায়িত্ববান মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারব, নাকি রাজনীতি ক্রমেই একটি বিশেষ শ্রেণির নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এইচআর/এমএস