সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সবচেয়ে বিব্রতকর প্রশ্নগুলোর একটি হলো — প্রাক্তনের সঙ্গে কি বন্ধুত্ব রাখা যায়? কারও কাছে বিষয়টি অসম্ভব মনে হয়, আবার কেউ কেউ দাবি করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বও সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি কেমন? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্ভব হলেও তা নির্ভর করে সম্পর্ক ভাঙার ধরন, আবেগের অবস্থান এবং দু’পক্ষের মানসিক পরিপক্বতার ওপর। কেন অনেকেই বন্ধুত্ব রাখতে চান দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটালে আবেগ, অভ্যাস ও স্মৃতি তৈরি হয়। হঠাৎ সব যোগাযোগ বন্ধ করা অনেকের জন্য কঠিন। বিশেষ করে যদি সম্পর্কটি সম্মান ও বোঝাপড়ার মধ্যেই শেষ হয়, তাহলে বন্ধুত্বের ইচ্ছা আসতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষ প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে চান পারস্পরিক সমর্থন, পরিচিতির নিরাপত্তা বা সামাজিক বৃত্তের কারণে। আরেকটি বড় কারণ হলো সন্তান। বাবা-মা দুজনই যদি সন্তানের জীবনে উপস্থিত থাকতে চান, তাহলে যোগাযোগ না রেখে উপায় নেই। তবে যোগাযোগ আর বন্ধুত্ব নিঃসন্দেহে এক জিনিস নয়। কখন বন্ধুত্ব সম্ভব নয় যদি সম্পর্ক ভাঙার পেছনে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা বা অসম্মান জড়িত থাকে, তাহলে বন্ধুত্ব মানসিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক পক্ষ যদি এখনো আবেগগতভাবে জড়িয়ে থাকে আর অন্য পক্ষ এগিয়ে যেতে চায় — সেই অসমতাও নতুন করে কষ্ট তৈরি করে। সময়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভাঙার পরপরই বন্ধুত্বের চেষ্টা সাধারণত সফল হয় না। মানসিক ক্ষত সারাতে সময় দরকার। গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত যোগাযোগ রাখলে দুঃখ, হিংসা ও বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। তাই আগে নিজেকে সময় দেওয়া জরুরি। নতুন সম্পর্কে প্রভাব প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব নতুন সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করতে পারে। বর্তমান সঙ্গীর নিরাপত্তাবোধ, বিশ্বাস এবং মানসিক স্বস্তির বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সব পক্ষ স্বচ্ছ না হলে এই বন্ধুত্ব অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কখন বন্ধুত্ব স্বাস্থ্যকর হতে পারে যদি দু’জনই স্পষ্টভাবে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে আবেগগত সীমা নির্ধারণ করতে পারেন, তাহলে বন্ধুত্ব সম্ভব। এক্ষেত্রে নিয়মিত যোগাযোগ নয়, বরং সীমিত ও সম্মানজনক সম্পর্কই বেশি স্বাস্থ্যকর। সন্তানের স্বার্থে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কেন জরুরি ডিভোর্স বা বিচ্ছেদের পর যদি দু’পক্ষের সন্তান থাকে, তখন প্রাক্তনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বৈরী সম্পর্ক শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা–মায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, কথা না বলা বা প্রকাশ্য বিরোধ শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, অপরাধবোধ ও আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বন্ধুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ সম্মানজনক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা শিশুদের জন্য নিরাপদ আবেগগত পরিবেশ তৈরি করে। এতে তারা বুঝতে শেখে যে সম্পর্ক ভেঙে গেলেও দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মান অটুট থাকতে পারে। তবে এখানে ‘বন্ধুত্ব’ মানে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নয়; বরং সন্তানের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে শান্ত ও পরিণত আচরণ। এই ধরনের সহমর্মী সম্পর্ক শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সম্পর্ক নিয়ে তাদের ভয়ের অনুভূতি কমায় এবং ভবিষ্যতে সুস্থ সম্পর্ক গড়ার ভিত্তি তৈরি করে। প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা সম্ভব, কিন্তু এটি সবার জন্য নয়। এটি কোনো বাধ্যবাধকতাও নয়। তাই নিজের মানসিক শান্তি, বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ), জার্নাল অব ফ্যামিলি সাইকোলজি, চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট জার্নাল, হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এএমপি